সারাদেশ

পলাশবাড়ীতে ৩০ কিলোমিটার সড়কে বৃক্ষ রোপণ করে স্মরণীয় হয়ে আছেন হাকিম স্যার

বায়েজিদ, পলাশবাড়ী গাইবান্ধাঃ

নিজ হাতে লাগানো গাছগুলো আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে তাঁর বৃক্ষপ্রেমের; মৃত্যুর পরও পরিচর্যা করছেন পরিবারের সদস্যরা

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে তাল, খেজুর, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন, বাঁশসহ বিভিন্ন ফলজ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষ রোপণ করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন প্রয়াত শিক্ষক ও বৃক্ষপ্রেমী আব্দুল হাকিম মন্ডল ধলু (হাকিম স্যার)। জীবদ্দশায় তাঁর হাতে লাগানো অসংখ্য গাছ এখন বড় হয়ে পথচারীদের ছায়া দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর স্মৃতিও বহন করছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পলাশবাড়ী উপজেলার ২ নম্বর হোসেনপুর ইউনিয়নের চেরেঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাকিম মন্ডল মেরীরহাট ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক ছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি তিন ছেলে ও এক কন্যাসন্তানের জনক।

প্রায় তিন দশক আগে থেকেই তিনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সড়কের দুই পাশে বৃক্ষ রোপণ শুরু করেন। চেরেঙ্গা গ্রামের করতোয়া বাঁধের সড়ক থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকার রাস্তার পাশে তিনি নিয়মিত গাছ লাগাতেন। গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর পরিচর্যাও করতেন নিজ হাতে।

হোসেনপুর ইউনিয়নের শালমারা ও ছোট শালমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা থেকে পশ্চিম দিকে করতোয়া বাঁধের রাস্তা হয়ে করতোয়া পাড়ার দুলাল ঠাকুরের বাড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করেন তিনি। এছাড়া মেরীরহাট বাজার, লক্ষ্মীপুর, সাইনদহ সবজি বাজার, অচিনতলা ব্রিজ পার হয়ে পশ্চিম দিকে কুরসিয়াপাড়া গ্রামের রাস্তার দুই পাশে, টুকনিপাড়া ঈদগাহ মাঠ থেকে চেরেঙ্গা রশিদের বাড়ি পর্যন্ত এবং খাসবাড়ি, কদমতলী, রামকৃষ্ণপুর, আকবরনগর ও দর্জিপাড়া এলাকার বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে তাঁর লাগানো গাছ রয়েছে।

এভাবে জীবদ্দশায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বৃক্ষ রোপণ করে তিনি এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেন। তাঁর এই ব্যতিক্রমী বৃক্ষপ্রেম ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৮ সালে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক তাঁকে ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে সনদ প্রদান করে।

পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য, গাছ লাগানো ছিল হাকিম স্যারের নেশার মতো। তিনি শুধু নিজেই গাছ লাগাতেন না, অন্যদেরও বৃক্ষ রোপণে উৎসাহিত করতেন। তাঁর লাগানো গাছগুলোকে তিনি সন্তানের মতো যত্ন করতেন।

এই বৃক্ষপ্রেমী মানুষটি ২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তবে মৃত্যুর পরও তাঁর বৃক্ষপ্রেমের উত্তরাধিকার ধরে রেখেছেন পরিবারের সদস্যরা।

হাকিম স্যারের ছোট ছেলে মো. মাসুম বিল্লাহ জানান, তাঁর বাবা যেভাবে গাছ লাগিয়েছেন, সেই পথেই পরিবারের সদস্যরা এখনো গাছগুলোর পরিচর্যা করে যাচ্ছেন। তাঁর মা খন্দকার দিলরুবা বেগমও নিয়মিত এসব গাছের যত্ন নেন। তাঁদের বাড়িটিও বর্তমানে অনেকটা বাগানবাড়িতে পরিণত হয়েছে।

মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমাদের কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। শুধু চাই, বাবার এই বৃক্ষপ্রেম ও মানুষের জন্য করা কাজটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে তুলে ধরা হোক। এতে মানুষ গাছের প্রতি আরও যত্নবান হবে এবং বৃক্ষ রোপণে উৎসাহিত হবে।’

সরেজমিনে হাকিম স্যারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বিভিন্ন স্থানে তালবীজসহ নানা ধরনের ফলজ, বনজ, ঔষধি ও অন্যান্য প্রজাতির বৃক্ষের চারা রয়েছে। চারাগুলো একটু বড় হলেই রাস্তার দুই পাশে রোপণ করার পরিকল্পনা রয়েছে পরিবারের।

তবে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের আঁধারে কিছু অসাধু ব্যক্তি অনেক গাছ কেটে ফেলছেন। কেউ কেউ আবার এসব গাছ জ্বালানি কাঠ হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে দীর্ঘদিনের বৃক্ষ রোপণের এই উদ্যোগ হুমকির মুখে পড়ছে।

এলাকাবাসী ও পরিবারের সদস্যরা এসব গাছ রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নজরদারি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

আজ হাকিম স্যার নেই। কিন্তু তাঁর নিজের হাতে লাগানো বড় বড় গাছগুলো যেন প্রতিদিনই তাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বৃক্ষগুলোই যেন বলে—মানুষ চলে যায়, কিন্তু মানুষের ভালো কাজ থেকে যায়। প্রকৃতি ও মানুষের জন্য রেখে যাওয়া তাঁর এই সবুজ উত্তরাধিকারই তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে।

বৃক্ষ নিধন নয়, বৃক্ষ রোপণ ও পরিচর্যায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে—এমনটাই প্রত্যাশা পরিবার ও এলাকাবাসীর। তাঁদের মতে, সম্মিলিত উদ্যোগে বেশি বেশি বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণ করা গেলে দেশের পরিবেশ আরও সবুজ ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,