কালীগঞ্জে বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগ,তদন্ত শেষ হয়নি ৫ মাসে
মারুফ হাসান (কালীগঞ্জ) গাজীপুর:
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বেগম রাবেয়া আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বেতন, পরীক্ষার ফি ও সেশন ফি আদায়, স্কুল প্রাঙ্গণে বালু ভরাটের সরকারি অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, শিক্ষক হয়রানি, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিভাষ কুমার সাহা, সহকারী শিক্ষক শাহানাজ পারভীন ও মৃত্যুঞ্জয় দত্ত এবং অফিস সহকারী মানস কুমার গুনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
গত ২৪ মে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে বিদ্যালয়ের ছয়জন সহকারী শিক্ষক লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে গত দুই বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের দাবি করা হয়। তবে অভিযুক্ত অফিস সহকারী মানস কুমার গুন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগের পর গত ৯ জুন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.টি.এম কামরুল ইসলাম চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। একাডেমিক সুপারভাইজার জিনাত রেহানা শারমীনকে আহ্বায়ক ও উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছাম্মৎ মাহমুদা বেগমকে সদস্য সচিব করা হয়। তিন বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও পাঁচ মাস পরও প্রতিবেদন জমা হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শিক্ষকদের ৩ লাখ ২১ হাজার ৬২০ টাকা বেতন নগদে দেওয়ার পর একই পরিমাণ অর্থ ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ব্যাংক থেকে চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। এছাড়া মেরামতকাজে অনিয়ম, হিসাবের গরমিল, ভুয়া ভাউচার, রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরযুক্ত পাতা ছিঁড়ে ফেলা এবং নিয়মিত হিসাব সমন্বয় না করার অভিযোগও রয়েছে।
২৮ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে অনুসন্ধানকালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিভাষ কুমার সাহা বলেন, তিনটি ব্যাংকের পাঁচটি হিসাবের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের লেনদেন পরিচালিত হয়। ২০১৮ সালের পর স্কুলের হিসাব অডিট হয়নি। তাঁর একক স্বাক্ষরে কোনো লেনদেন হয় না; সভাপতি ও যৌথ স্বাক্ষরের মাধ্যমে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে ২০২৪ সালের হিসাবের কিছু নথি এবং মেরামত ও উন্নয়নকাজে দরপত্র বা কোটেশনের কাগজপত্র তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেননি।
বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম ১৩ মার্চ ২০২৫ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন এবং ১৬ মার্চ ব্যবস্থাপনা কমিটি তা অনুমোদন করে। তবে প্রায় ১০ মাস পর, ২৪ ডিসেম্বর জেলা শিক্ষা অফিসকে বিষয়টি জানানো হয়। কেন এত দেরিতে জানানো হলো এবং দীর্ঘ সময় প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য ঘোষণা করে চাহিদা দেওয়া হয়নি—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী শিক্ষক অভিযোগ করেন, অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার কাগজ, প্রশ্নপত্র ও ফটোকপি এবং তিনটি জানালার গ্রিল তৈরির খরচে গরমিল রয়েছে। ২০২৪ সালের ভাতা বিতরণী রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরযুক্ত পাতা ছেঁড়ার ঘটনায় বর্তমান এডহক কমিটির সভাপতি কাউছার আহমেদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেন তিনি।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে এডহক কমিটির সভাপতি কাউছার আহমেদ বলেন, তিনি প্রায় তিন মাস ধরে সভাপতির দায়িত্বে আছেন এবং তাঁর সময়ে কোনো অনিয়ম হয়নি। রেজিস্ট্রারের পাতা ছেঁড়ার সঙ্গেও তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় বিস্তারিত বলতে চাননি তিনি।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক জিনাত রেহানা শারমীন বলেন, তদন্তকারী দল চারবার বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে শিগগিরই ইউএনওর কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.টি.এম কামরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আল মামুন তালুকদারের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।





