নৌঘাঁটির পাশে এনসিটি বিদেশি হাতে, সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। চলমান সরকারের আমলে লাভজনক ভিত্তিতে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটি তড়িগড়ি দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। এই টার্মিনালের পাশেই নৌবাহিনীর সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘ঈশা খাঁ ঘাঁটি’। ফলে কোনো ধরনের পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই বন্দরের মতো কৌশলগত স্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন অনেকে।
এনসিটি ইজারার প্রতিবাদে গত ৬ দিন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন করলেও আজ রোববার থেকে আবার টানা ধর্মঘট শুরু করেছে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন। এর ফলে বন্দরের পণ্য ডেলিভারির জন্য কাভার্ড ভ্যান, লরি ও ট্রেলার প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। এতে করে বন্দরের পরিচালন কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিভিন্ন জেটিতে সব ধরনের পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা বন্ধ রয়েছে, থেমে আছে পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রমও।
চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম যত দ্রুত সম্ভব পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচেম বাংলাদেশ)। গত বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউরোচেম জানায়, স্বাভাবিক অবস্থায় দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। কিন্তু বর্তমানে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় রপ্তানি কনটেইনার মুভমেন্ট প্রায় সম্পূর্ণভাবে থেমে গেছে। কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের কারণে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনারে আটকে আছে প্রায় ৬৬ কোটি ডলারের রপ্তানি পণ্য।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডগুলোতে জমে আছে ৩৮ হাজারের বেশি টিইইউএস কনটেইনার। এর মধ্যে প্রায় ২৯ হাজারের বেশি এফসিএল (ফুল কনটেইনার লোড), যেগুলো সরাসরি আমদানি ও রফতানির সঙ্গে যুক্ত। বন্দরের ভেতরে আটকে আছে প্রায় ১ হাজার টিইইউএস রপ্তানি কনটেইনার। এ ছাড়া, বেসরকারি আইসিডিগুলোতে পড়ে আছে ১৩ থেকে ১৪ হাজারের বেশি রপ্তানি কনটেইনার প্রায় ১ হাজার ৫০০ কনটেইনার রয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি ডিপোতে, আরও ১ হাজার ৭৫০টি কনটেইনার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে পাঠানোর অপেক্ষায় রয়েছে।
বহির্নোঙরে জাহাজের জট
বন্দর অচলাবস্থার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে বহির্নোঙরে। সেখানে এখন অপেক্ষমাণ রয়েছে, জ্বালানি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার, ৫০টির বেশি কনটেইনার জাহাজ
১০০টির বেশি বাল্ক ক্যারিয়ার। প্রতিদিন নতুন জাহাজ আসায় বার্থিং শিডিউল সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিপিং সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ প্রতিটি জাহাজের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই এই ক্ষতির অঙ্ক পৌঁছেছে শত শত কোটি টাকায়।
এদিকে, রোববার সকাল থেকে বন্দরের ভেতরে কোনো ধরনের ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন প্রবেশ করেনি। আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে, বন্দর ও আশপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড নিয়ে প্রশ্ন
জানা গেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড বর্তমানে ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ৪০টিরও বেশি বন্দর পরিচালনা করছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া, যে টার্মিনাল পরিচালনার জন্য তাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাড়তি বিনিয়োগ করার সুযোগ নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিরোধের প্রসঙ্গ
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ঘিরে আফ্রিকার জিবুতিতে টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে পুরোনো বিরোধের প্রসঙ্গও আবার সামনে এসেছে। সূত্র বলছে, বিশ্বব্যাংকের পিপিপি রিসোর্স সেন্টারের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০০৪ সালে জিবুতি ল্যান্ডলর্ড মডেলে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি করে। চুক্তির শর্ত ছিল, একই এলাকায় জিবুতি অন্য কোনো বন্দর ইজারা দিতে পারবে না।
টার্মিনাল চালুর পর ২০০৯ সালে জিবুতি সরকার চুক্তির শর্ত ভেঙে একই এলাকায় আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি করে। এ কারণে জিবুতি সরকার ২০১৮ সালে সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিটি বাতিল করে। পরে ডিপি ওয়ার্ল্ড লন্ডনের আদালতে গেলে আদালত জিবুতি সরকারকে সুদসহ ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং স্বত্ব বাবদ আরও ১৪৮ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে জিবুতি সরকার এই রায় মানেনি। উল্টো আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে করা সব চুক্তি বাতিল করে দেয় তারা।
যুক্তরাষ্ট্রেও চুক্তি হয়নি
যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর পরিচালনাকারী ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান পিঅ্যান্ডও পোর্টস ২০০৬ সালে ডিপি ওয়ার্ল্ড অধিগ্রহণ করে। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি বন্দর পরিচালনা করছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর পরিচালনার সুযোগ আসে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে। তবে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ রাজনৈতিক চাপে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সেই সুযোগ দেননি। পরে বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হয়।
নৌ উপদেষ্টার বক্তব্য
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে এসে নৌ উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ঘিরে তৈরি হওয়া সন্দেহ অমূলক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড এলে বন্দরে নতুন করে বিনিয়োগ হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আসবে। একই সঙ্গে বন্দরের আয় ও সক্ষমতা বাড়বে। তখন চট্টগ্রাম বন্দর আরও বেশি কনটেইনার পরিচালনা করতে পারবে এবং বন্দর রূপান্তরিত হবে বিশ্বমানের বন্দরে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন বলেন, সকাল থেকেই আমাদের ধর্মঘট চলছে, কোথাও কোনো কাজ হচ্ছে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে শতভাগ সমর্থন দিয়ে কাজে যোগ দেননি। তিনি আরও বলেন, আন্দোলন দমাতে শামসু মিয়া ও আবুল কালাম আজাদ নামে তাদের দুজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়েছে বলে তারা খবর পেয়েছেন।
চার দফা দাবি
গত শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সংবাদ সম্মেলন করে সংগ্রাম পরিষদের নেতারা রোববার সকাল ৮টা থেকে লাগাতার ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে, আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার ও
এনসিটি ইজারার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা/বাতিল করা।
গত ৩১ জানুয়ারি কর্মবিরতি শুরু করে সংগঠনটি। দফায় দফায় বৈঠক হলেও সমঝোতা না হওয়ায় টানা ছয় দিন কর্মবিরতি চলে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসে শ্রমিক-কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করা হলেও আজ রোববার থেকে আবার টানা ধর্মঘট শুরু হয়েছে।
একাধিক পরিবহন মালিক ও চালকরা জানান, বন্দরে পণ্য ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তারা পণ্য ডেলিভারি করতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন। যানবাহন বন্দরের ভেতরে ঢুকতে না পারায় গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়ছে বলেও তারা জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্দরের সংকট এখন আর শুধু শ্রমিক আন্দোলন কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন জাতীয় অর্থনীতি, রফতানি সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, দ্রুত উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন হবে। প্রতিটি অতিবাহিত দিন দেশের জন্য বাড়তি ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। সমাধানের পথ দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি কোম্পানির আগমন ঘটে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার মাধ্যমে। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা খরচ করে পতেঙ্গায় ‘পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল’ নির্মাণ করেছিল। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর জি টু জি আওতায় সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় ২২ বছর পিসিটি পরিচালনা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
এর ধারাবাহিকতায় গত বছর নভেম্বরে একই সঙ্গে দুটি টার্মিনাল পরিচালনার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় দুই বিদেশি কোম্পানিকে। পতেঙ্গার লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে ডেনমার্কের এপি মলারকে (মায়ের্সক) ৪৫ বছরের জন্য এবং ঢাকার পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনায় সুইজারল্যান্ডের মেডলগকে (এমএসসি) ২২ বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবার একই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে।




