দেবীগঞ্জ পিআইও অফিসের ৬ প্রকল্প ঘুরে আবারও দেখা মিলল অনিয়ম আর দূর্নীতির
একেএম বজলুর রহমান, পঞ্চগড়
এরআগেও পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের রাস্তার এইচবিবি করন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দূর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগের সংবাদ প্রকাশ হলেও পিআইও বাবুল চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কোন ব্যবস্থা, গ্রহন করা হয়নি তদন্ত কমিটি। এনিয়ে অধিদপ্তরসহ জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত অভিযোগ দেয়ার পরেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এর রেশ না কাটতেই সম্প্রতি গণমাধ্যমকর্মীরা বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রকল্প ঘুরে আবারও অনিয়ম আর দূর্নীতির দেখা পান। সেসব প্রকল্পে সরকারী অর্থ লুটপাট করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। প্রকল্প সভাপতিরা দাবি করছেন পিআইও অফিসের চাহিদামত শতকরা ১০ ভাগ আর প্রকল্পের কমিটির সদস্যদের টাকা দেয়ার কারনে প্রকল্পের কাজে অনিয়ম আর দূর্নীতি হয়।
দেবীগঞ্জ উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের গাইবান্ধাপাড়া রেজিয়া বেগমের বাড়ির পশ্চিমে ইউড্রেন নির্মাণ ও মাটি ভরাটের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ৩ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। এ প্রকল্প সরজমিনে গেলে প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য বক্তিয়ার রহমান এসব কথা বলেন।
স্থানীয়রা জানান, সেখানে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার বরাদ্দ হলেও কাজ হয়েছে প্রায় ২ লাখের মত। বাকি টাকা আত্বসাত করা হয়েছে।
চিলাহাটি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লালচান পাড়া হবিবরের বাড়ির পশ্চিমে কালভার্ট নির্মান বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয় ৩ লক্ষ টাকা। কাজ শুরু করার জন্য দেড় লক্ষ টাকা প্রদান করা হলেও কাজ শুরু না করে টাকাগুলো পকেটস্থ করেছেন প্রকল্প সভাপতি লুৎফর রহমান। তিনি চিলাহাটি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য। কাজ কেন শুরু করছেন না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন মাটি পাইনি তাই কাজ শুরু করতে পারছিনা। দীর্ঘদিন ধরে কাজ না করে সরকারি টাকা নিজের পকেটে রাখা কতটুকু যুক্তিগত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সুন্দরদীঘি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দাড়ারপাড় মাদরাসার পশ্চিমে ঠেকারের বাড়ির পার্শ্বে ইউড্রেন নির্মান বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। সেখানে সরজমিনে গিয়ে দেখা নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজনেরা জানান, প্রকল্পে যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তাতে সে টাকার কাজ হয়নি। তাদের ধারনা এখানে প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মত খরচ করা হয়েছে। বাকি টাকার দূর্নীতি করা হয়েছে।
দেবীডুবা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পেড়ালবাড়ি গুচ্ছগ্রামের মোড় হতে মহন্তপাড়া হয়ে কুসুমের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ও কালভার্ট নির্মান বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ লক্ষ ১ হাজার টাকা। সেখানে গিয়ে দেখা যায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সরকারি বরাদ্দের টাকা লুটপাট করা হয়েছে। প্রকল্পের সভাপতি, দেবীডুবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরেশ চন্দ্র রায় ও পিআইও বাবুল চন্দ্র রায় মিলে মিশে টাকা আত্বসাত করেন। স্থানীয়রা জানান, এখানে রাস্তা একটু উচু নিচু ছিল। সামান্য মাটি এনে এবং লোকজন দিয়ে মাটি ছেটে সমান করে দেয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা আরও জানান, ইউএনও স্যার সরজমিনে আসার পর আমরা কাজের বিষয়ে আপত্তি করেছিলাম। তারপরেও প্রকল্প সভাপতি রাস্তার না কাজ করে বাকি টাকা আত্বসাত করেছেন।
দন্ডপাল ইউনিয়নের৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুপাড়িতলী মসজিদ থেকে পূর্ব পাশে সিরাজের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় মাটি ভরাটের বরাদ্দ দেয়া হয় ২ লক্ষ টাকা। সেখানে বাস্তবে কোন কাজ হয়নি। স্থানীয় লোকজন মিলে রাস্তায় মাটি ফেলে খালখন্দ ভরাট করা হয়। এটি প্রকল্প নেয়ার আগেই মাটি ভরাট করা হয়। মাটি ভরাট করার পরে সেখানে প্রকল্প দেখিয়ে পুরো টাকাই আত্বসাত করা হয়েছে। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য মনতাজ আলী ও পিআইও বাবুল চন্দ্র রায় মিলে এ টাকা আত্বসাত করেন।
আরও জানা যায়, প্রকল্প সভাপতি মনতাজ আলীকে ৮০ হাজার দিয়ে ১ লাখ ২০ টাকা পিআইও বাবুল চন্দ্র রায় নিজে নিয়েছেন।
আরেকটি প্রকল্প মনতার বাড়ি হতে ইউসুফের বাড়ি পর্যন্ত রাস্ত সংস্কার ও কালভার্ট নির্মানের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ২ লক্ষ টাকা। স্থানীয়রা জানান, সেখানে সামান্য কিছু মাটি দেয়া হলেও কালভার্টের কাজ করা হয়েছে নামে মাত্র। তাদের ধারনা সেখানে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মত আত্বসাত করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজটি করেন দন্ডপাল ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য অবিনাশ রায়।
দেবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রকল্পের কাজগুলো সঠিক ভাবে তদারকি করলে এসব অনিয়ম আর দূর্নীতি কমানো সম্ভব বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
শালডাংগা ইউনিয়নের রাস্তার সিসি করনের জন্য বরাদ্দ দেয়া
হয় ৮ লক্ষ টাকা। সরজমিনে দেখা যায়, ১০ ইঞ্চি করে রড দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে ১২ থেকে ১৪ ইঞ্চি করে। দৈর্ঘ্য দেয়া হয়েছে ২২ ইঞ্চি। দেয়া হয়েছে নিম্নমানের ইটের খোয়া। ২/৩ নাম্বার ইটের খোয়ার সাথে রয়েছে রাবিশ। ইটের খোয়া আর বালু দেয়া হয়েছে প্রতি বস্তায় ৮ টলি। যেখানে দেয়ার নিয়ম রয়েছে ৪ টলি করে। ঢালাই দেয়ার সময় দেবীগঞ্জ প্রকল্প অফিসের কেউ ছিলনা। প্রকল্প সভাপতি শালডাংগা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন না।
প্রকল্প কর্মকর্তা বাবুল চন্দ্র রায় বলেন, ইটের খোয়া ৪ টি দেয়ার নিয়ম রয়েছে। ৮ টি দেয়ার নিয়ম নাই। ঢালাই দেয়ার সময় অফিসের কেউ উপস্থিত না থাকার বিষয়ে বলেন, রুবেল নামের এক মিস্ত্রি সেখানে আছে। সে কাজ করছে এবং দেখাশোনা করছে। তিনি অফিসের কে জিজ্ঞেস করলে তিনি কোন উত্তর দেননি। ধারনা করা হচ্ছে ৮ লক্ষ টাকার মধ্যে সেখানে প্রায় ৫/৬ লাখ টাকার কাজ হয়েছে।





