সারাদেশ

পাঁচলাইশের হামজা খাঁ লেইন ও সংলগ্ন আবাসিকে কিশোর গ্যাং ও মাদকের স্বর্গরাজ্য, আতঙ্কে এলাকাবাসী

চট্টগ্রাম ব্যাুরো:
চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন হামজারবাগ হামজা খাঁ লেইন এবং এর আশপাশের বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকা এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। হামজা খাঁ লেইনের অধীন বিভিন্ন বাই লেইন, এগারো তলা রূমা টাওয়ারের পাশের গলি, মোল্লার দোকান, জাহেদের চায়ের দোকান, সাইফুলদের ভাড়া ঘর, আলিফ টাওয়ারের পাশের গলি, গাউছিয়া আবাসিকের মুখ, কবির হাউজিং সোসাইটি ২ নম্বর গলি, রাশেদগঞ্জ আবাসিক এলাকার ব্রিজ এবং রাশেদগঞ্জে ডা. আজিজের ঘরের পাশের রাস্তা এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদকাসক্ত, মাদক ক্রেতা-বিক্রেতা ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে স্থানীয় সাধারণ জনগণ চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিষিদ্ধ দল আওয়ামী ফ্যাসিষ্টের কর্মী বাহিনী, কিশোর গ্যাং ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের চলাচল এই মহল্লায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তারা প্রতিনিয়ত এলাকায় জড়ো হয়ে সামান্য কথাতেই দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। প্রকাশ্য ও গোপনে মাদক সেবন, মাদক ক্রয়-বিক্রয়, অশ্লীল কথাবার্তা, গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দে গান-বাজনা, হৈ-চৈ, দলাদলি ও আইনশৃঙ্খলা বিরোধী নানা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে তারা। ইতিমধ্যে এদের অনেকেই অহরহ চুরি, ছিনতাই ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসী জানান, ইতিপূর্বে এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মাধ্যমেই এলাকায় দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন মাগরিবের পর থেকেই রূমা টাওয়ারের আশপাশে অপরাধীদের আড্ডা বসে। এছাড়া সাইফুলদের ভাড়া ঘরের সামনে গভীর রাত পর্যন্ত বড় শব্দে গান-বাজনা চালানো, হৈ-চৈ করা, বাজি ফোটানো, ঝগড়া-বিবাদ ও অশোভন আচরণের কারণে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যে, হামজারবাগ মোড়ে অবস্থিত ‘জিলানী সাইকেল মার্ট’ (যার মালিক রেজাউল করিম) নামক দোকানটিতে কিশোর গ্যাং এবং ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কাছে নিয়মিত নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রি করা হয়। স্থানীয় সচেতন মহল বারবার নিষেধ করার পরও এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা যায়নি।
এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পাঁচলাইশ মডেল থানার পুলিশ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে দুই-একজন অপরাধীকে ধরে নিয়ে গেলেও রহস্যজনকভাবে কিছুক্ষণ পরই তাদের ছেড়ে দেয়। এতে অপরাধীদের সাহস আরও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে মাদক সংক্রান্ত বেশ কয়েকজন সুনির্দিষ্ট অপরাধীকে আটক করার পরও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো- মাদক বিক্রেতা ও ছাত্রলীগ ক্যাডার মৃত সালেহ আহাম্মদের ছেলে মো. আসিফ আহাম্মদ রাখি, মাদক বিক্রেতা যথাক্রমে মৃত সিরাজ মিয়ার ছেলে মো. জাহাঙ্গীর, মৃত আবদুর রশীদ ড্রাইভারের ছেলে মো. হারুন রশীদ, মোঃ বক্সুর ছেলের মো. ফারুক ও মো. ইসমাইলের ছেলে মো. ইমরান সহ আরও অনেকে।
একইভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে কিশোর গ্যাংয়ের মূল সদস্যদেরও ধরে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কিশোর গ্যাং নেতা মোঃ জসিমের ছেলে মো. সাহিল, কিশোর গ্যাং সদস্য যথাক্রমে মো. বেলাল ড্রাইভারের ছেলে মো. সিয়াম, জাঙ্গীর আলমের ছেলে মো. রাহুল, মোঃ জাহাঙ্গীরের ছেলে মো. জিসান প্রকাশ কুনু, মোঃ মিয়ার ছেলে মো. আফরান, ও মোঃ আবুর ছেলে মো. সিফাত সহ আরও বেশ কয়েকজন।
অপরাধীদের এমন দাপটের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য এলাকাটি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকায় এবং কোনো কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় স্থানীয়দের মনে তীব্র হতাশা, ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
ইদানীং এই এলাকায় কিশোর গ্যাং ও আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীদের মিছিল-মিটিংয়ের তৎপরতা অতীতের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদকাসক্ত কিশোর ও যুবকরা বেপরোয়া হয়ে চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ায় এলাকায় পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে।
এমতাবস্থায়, স্থানীয় সচেতন মহল ও শান্তিপ্রিয় এলাকাবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাদক ও কিশোর গ্যাং মুক্ত সমাজ গড়ার ডাক দিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি আদর্শ ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে তারা প্রশাসন, অভিভাবক সমাজ, উদীয়মান ক্লাব কমিটি এবং হামজা খাঁ লেইন মহল্লা কমিটিসহ সর্বস্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছেন। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এলাকাটিকে অপরাধমুক্ত করতে পাঁচলাইশ মডেল থানার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, রাত্রিকালীন টহল বৃদ্ধি এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে অবিলম্বে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানিয়ে দ্রুত সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলমান রয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, এসব গ্যাংয়ের পেছনে যেসব ‘বড় ভাই’ পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,