জাতীয় সারাদেশ

জুয়েল ইসলাম, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার এক সাধারণ যুবকের অসাধারণ সাফল্যের গল্প এখন অনুপ্রেরণা ছড়াচ্ছে চারদিকে। ফুল চাষ করে নিজের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন নাজমুল ইসলাম। যে মানুষটি একসময় মাসে মাত্র তিন হাজার টাকায় অন্যের বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, তিনিই আজ বছরে পাঁচ লাখ টাকার বেশি আয় করছেন নিজস্ব ফুলের খামার থেকে।
তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের শেরমস্ত বানিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নাজমুল ইসলামের জীবনগল্প যেন সংগ্রাম আর সাফল্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। ২০০৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন পারিবারিক অভিমানের জেরে বাবার সঙ্গে মনোমালিন্য হলে তিনি রাগ করে ঢাকার সাভারে চলে যান। সেখানে একটি ফুলের বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। অল্প বেতনে কষ্টের জীবনযাপন করলেও তিনি হাল ছাড়েননি।
বরং সেই কঠিন সময়টাকেই তিনি নিজের শিক্ষার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগান। ফুল চাষের প্রতিটি ধাপ—চারা রোপণ, পরিচর্যা, রোগবালাই দমন, ফুল সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সবকিছু মনোযোগ দিয়ে শেখেন। টানা আট বছরের অভিজ্ঞতা তাকে করে তোলে দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী।
২০১৫ সালে গ্রামে ফিরে এসে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন নাজমুল। নিজের সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মাত্র ১০ শতক জমিতে গোলাপ চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরেই খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ হয়, যা তাকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।
ধীরে ধীরে তিনি তার চাষের পরিধি বাড়াতে থাকেন। বর্তমানে প্রায় তিন বিঘা জমিতে গোলাপ, গাঁদা, জিনিয়া এবং গ্লাডিওলাস ফুলের চাষ করছেন। তার বাগানে এখন নিয়মিত কাজ করছেন তিনজন শ্রমিক, যাদের মাসিক মোট বেতন ২১ হাজার টাকা। পাশাপাশি তারাগঞ্জ বাজারে নিজস্ব ফুলের দোকান গড়ে তুলেছেন, যা তার আয়ের পথকে আরও বিস্তৃত করেছে।
ফুল চাষের আয় দিয়েই তিনি ইতোমধ্যে একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। তার এই সাফল্য স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং তরুণদের জন্য হয়ে উঠেছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নাজমুল ইসলাম বলেন, “চেষ্টা, ধৈর্য আর পরিশ্রম থাকলে সফলতা আসবেই। শুরুতে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছে, কিন্তু আমি থেমে থাকিনি।”
তিনি জানান, তারাগঞ্জে ফুলের চাহিদা তুলনামূলক কম হলেও পাশ্ববর্তী সৈয়দপুর ও রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে তার বাগান থেকে ফুল কিনে নিয়ে যান। ফলে বাজারজাতকরণে কোনো সমস্যা হয় না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “আগামীতে রজনীগন্ধা ফুলের চাষ শুরু করতে চাই। পাশাপাশি আরও জমি লিজ নিয়ে ফুলের আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”
নাজমুলের মতে, সরকারি সহায়তা পেলে এই খাতে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, “এ ধরনের উদ্যোক্তাদের আমরা সবসময় সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। তিনি যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মতে, নাজমুল ইসলামের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়—এটি এলাকার বেকার যুবকদের জন্য এক অনুপ্রেরণার বাতিঘর। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে তার উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও অনেক তরুণকে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,