কাঠ-হাতুড়ির শব্দে মুখর জেলে পল্লী; সুন্দরবনের মৌসুমে বোট নির্মাণে ব্যস্ত কারিগররা
এম জালাল উদ্দীন:পাইকগাছা(খুলনা)
সুন্দরবনে নতুন মৎস্য আহরণ মৌসুমকে সামনে রেখে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার জেলে পল্লীগুলোতে শুরু হয়েছে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য। নতুন বছরের মাছ ধরার নৌকা নির্মাণ ও পুরোনো নৌকা সংস্কারের কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। কাঠ, পেরেক ও হাতুড়ির অবিরাম শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের হিতামপুর (বোয়ালিয়া) জেলে পল্লী।
সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ ধরার প্রস্তুতিতে কোনো কমতি রাখছেন না জেলেরা। প্রতিটি বোটে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল নিয়ে তারা সুন্দরবনের নদী-খালে প্রায় ছয় মাস অবস্থান করে মাছ আহরণ করবেন। এই মৌসুমের আয়ের ওপরই নির্ভর করে তাদের পুরো বছরের সংসার।
স্থানীয় জেলে অশোক মণ্ডল প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি বড় মাছ ধরার বোট নির্মাণ করছেন। বোটটি ৬০ ফুট লাম্বা ও ১২ ফুট চওড়া। পাকা মেহগনি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এ বোট। নির্মাণকাজ শেষ হলে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল নিয়ে তিনি সুন্দরবনের ধুবলারচরের আলোর খাল এলাকায় মাছ ধরতে যাবেন। তার আশা, নতুন মৌসুমে মাছের ভালো উৎপাদন হলে বিনিয়োগের যথাযথ প্রতিফল মিলবে।
জেলেরা জানান, প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে তারা সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং টানা প্রায় ছয় মাস, অর্থাৎ জুন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে মাছ আহরণ করেন। এ সময় একটি বোটের মাঝি প্রায় ২ লাখ টাকা এবং প্রতিজন জেলে ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পান বোট মালিকের থেকে।
স্থানীয় জেলে শ্রীবাস বিশ্বাস বলেন, আমরা অশোক মণ্ডলের বোটে করে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাই। সেখানে প্রায় ছয় মাস থাকতে হয়। এ সময়ে মাছ আহরণের অংশ হিসেবে ভেটকি, কোরাল, পারশে, পোয়া, ভাঙ্গন, ট্যাংরা, খয়রা, তপসে, বাইন, চেউয়া, বেলে, ফ্যাসা, কৈভোল, লইট্টা, রূপচাঁদাসহ নানা প্রজাতির মাছ ধরা হয়। পাশাপাশি বাগদা চিংড়ি ও কাঁকড়াও আহরণ করা হয়।
তিনি জানান, আহরিত মাছের একটি অংশ খুলনা ও চট্টগ্রামের আড়তে পাঠানো হয়। বাকি মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা হয়, যা জেলেদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
জেলেদের ভাষ্য, সুন্দরবনে দীর্ঘ সময় মাছ আহরণই তাদের পরিবারের প্রধান জীবিকা। তাই প্রতি বছর মৌসুম শুরুর আগেই নতুন বোট নির্মাণ ও পুরোনো বোট মেরামতের কাজ জোরেশোরে শুরু হয়। তাদের প্রত্যাশা, এবারও ভালো মাছ ধরা পড়বে, আর সেই আয়েই সারা বছরের সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে।
জেলে পল্লীর ব্যস্ততা আর নতুন বোট নির্মাণের এই কর্মযজ্ঞ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সুন্দরবনের নতুন মৎস্য আহরণ মৌসুমকে ঘিরে উপকূলের জেলেদের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। নতুন মৌসুমকে ঘিরে তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে নতুন স্বপ্ন, নতুন আশার আলো।
উল্লেখ্য, পাইকগাছা উপজেলার সবচেয়ে বড় জেলে পল্লী গদাইপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া (হিতামপুর) এলাকায় অবস্থিত। এছাড়া উপজেলার চাঁদখালী-দেবদুয়ার, হরিঢালীর মাহমুদকাটি এবং কপিলমুনি নোয়াকাটিতেও উল্লেখযোগ্য জেলে পল্লী রয়েছে, যাহারা প্রতিবছর সুন্দরবনে মাছ আহরণে যায়।
এ বিষয়ে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক বলেন, সম্প্রতি (এডিপি)-এর অর্থায়নে উপজেলার ১৩৫ জন সমুদ্রগামী জেলের মাঝে নিরাপদ মৎস্য আহরণ নিশ্চিত করতে লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও জেলেদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে এ ধরনের সহায়তামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।





