উল্লাপাড়ায় সন্ত্রাসী কায়দায় চলছে অপসাংবাদিকতা; সাংবাদিকতার আড়ালে গ্রুপিং, প্রভাব বিস্তার ও হুমকির অভিযোগে উদ্বেগ
মেসবাহুল হক মাসুম, উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকতার নামে এক ধরনের অপসাংবাদিকতা, গ্রুপিং এবং প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল, শিক্ষক সমাজ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ একটি স্বার্থান্বেষী চক্র সাংবাদিক পরিচয়কে ব্যবহার করছে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল, আধিপত্য বিস্তার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে। এতে একদিকে যেমন সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মাঝেও তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক ও অনাস্থা।
অভিযোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কোনো ধরনের পেশাগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল আইপি টিভি, স্যাটেলাইট টিভি ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে অনেকে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। অর্থের বিনিময়ে “কার্ডধারী সাংবাদিক” হয়ে তারা সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলেও জানা যায়। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব তথাকথিত সাংবাদিকদের অসদাচরণের অভিযোগ বাড়ছে। একাধিক শিক্ষক জানান, তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে সংবাদ প্রকাশের হুমকি, অপমানজনক আচরণ এবং অযৌক্তিক চাপ প্রয়োগের মতো ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলবদ্ধভাবে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টাও করা হচ্ছে। এতে শিক্ষক সমাজের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট মহল নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং তৈরি করে এলাকায় এক ধরনের আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করছে। কেউ তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ, সামাজিক অপপ্রচার কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানো হচ্ছে। ফলে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী কিছু স্বনামধন্য পত্রিকার প্রতিনিধি নিজেদের অবস্থান ও প্রভাব টিকিয়ে রাখতে এসব নব্য সাংবাদিক তৈরির কারিগর হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। তাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রশ্রয়ে অযোগ্য ও অপেশাদার ব্যক্তিরা সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র ব্যবহার করে এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সচেতন মহলের মতে, ব্যক্তিস্বার্থে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র বিতরণ ও অযোগ্য ব্যক্তিদের উৎসাহিত করার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
মফস্বল সাংবাদিকতায় যেখানে অধিকাংশ সংবাদকর্মীর নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা নেই, সেখানে এত মানুষের সাংবাদিকতায় ঝুঁকে পড়ার প্রকৃত কারণ কী? যদি এটি জনস্বার্থে কাজ করার আন্তরিকতা না হয়ে থাকে, তবে তাদের আয়ের উৎস কোথায়? এই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
প্রকৃত সাংবাদিকরা বলছেন, সাংবাদিকতা কখনোই ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী আচরণের মাধ্যম হতে পারে না। এটি একটি দায়িত্বশীল পেশা, যার মূল লক্ষ্য সত্য প্রকাশ, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা। কিন্তু কিছু অসাধু ও অযোগ্য ব্যক্তির কারণে পুরো পেশাটিই আজ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
উল্লাপাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি আনিসুর রহমান লিটন জানান, সাংবাদিক পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন, পেশাগত যোগ্যতা যাচাই এবং সাংবাদিক পরিচয়ে অপকর্ম, অপসাংবাদিকতা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রকৃত সাংবাদিক ও অপসাংবাদিকদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করে সাংবাদিকতার পবিত্রতা, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সমাজের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।





