৯৯৯-এ কল করেও মিলল না নিস্তার, পুলিশের ইশারায় রাতভর যুবককে পাশবিক নির্যাতন!
মোঃ হামিদুজ্জামান জলিল স্টাফ রিপোর্টার।।
আইন ও বিচার যেখানে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, সেখানে খোদ পুলিশের উপস্থিতিতে ও পরোক্ষ হুকুমে একজন নাগরিককে রাতভর পিটিয়ে মুমূর্ষু করার মতো শিউরে ওঠা অভিযোগ উঠেছে ঝিনাইদহের মহেশপুরে। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করে প্রাণভিক্ষা চেয়েও মেলেনি মুক্তি; উল্টো পুলিশের মদদে চলল দফায় দফায় মধ্যযুগীয় বর্বরতা। শুধু নির্যাতনই নয়, ভুক্তভোগীর মোটরসাইকেলটি কৌশলে থানায় নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
গত ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যায় মহেশপুর থেকে বাড়ি ফেরার পথে বেলেমাঠ বাজারের কাছে হামলার শিকার হন রাজেদুল ইসলাম। পারিবারিক কলহের জেরে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন (আব্দুল মোতালেব ও ইমরান গং) কাঠের বাটাম দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করে। এরপর তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে ১ নং আসামির বাড়িতে নিয়ে গিয়ে শিকল দিয়ে চেয়ারের সাথে বেঁধে রেখে চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।
মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত রাজেদুল বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে ৯৯৯-এ কল করেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মহেশপুর ফাঁড়ির আইসি মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন ও এএসআই আলমগীর হোসেন ঘটনাস্থলে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে উপস্থিত হয়ে পুলিশ যে ভূমিকা পালন করে, তা সভ্য সমাজকে হার মানায়।
ভুক্তভোগী রাজেদুল ইসলাম তার জবানবন্দিতে জানান:
”আমি ভেবেছিলাম পুলিশ এসেছে, এবার হয়তো বাঁচব। কিন্তু পুলিশ আসার পর তারা আসামিদের সাথে প্রায় ২০ মিনিট একান্তে ফিসফাস করে কথা বলে। এরপর আমাকে উদ্ধারের বদলে উল্টো ধমক দিয়ে বলে— ‘তুই এখানে কেন এসেছিস? পিটা শালারে!’ এই বলে পুলিশ চলে যায়।”
পুলিশের এই ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পর আসামিরা যেন আরও রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে। সারারাত ধরে চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। কেড়ে নেওয়া হয় নগদ টাকা এবং জোরপূর্বক সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়।
পরদিন কোনোমতে পালিয়ে রাজেদুল কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। স্থানীয় থানায় প্রতিকার না পেয়ে তিনি ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার (এসপি) কার্যালয়ে দ্বারস্থ হন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এসপি কার্যালয়ের নির্দেশে মহেশপুর থানার ওসির সাথে দেখা করতে গেলে সেই অভিযুক্ত আইসি ও এএসআই তাকে ওসির কক্ষে ঢুকতে বাধা দেন এবং পুনরায় মারধরের হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন।
অভিযোগ উঠেছে, পরদিন বেলা ১২টার দিকে অভিযুক্ত ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা আবারও রাজেদুলের কাছে হাজির হন। তবে তারা তাকে আইনি সহায়তা দিতে নয়, বরং ১৫০ টাকার সাদা স্ট্যাম্পে সই নিয়ে তার পালসার ১৫০ সিসি মোটরসাইকেলটি জোরপূর্বক থানায় নিয়ে যান।
ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন।
আইসি মোঃ জাহাঙ্গীর আলম: তিনি জানান, “আমি যা করেছি ওসি স্যারের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করেছি।”
এএসআই মোঃ আলমগীর হোসেন: তিনি নিজের দায় অস্বীকার করে বলেন, “আমি জাহাঙ্গীর স্যারের সাথে গিয়েছিলাম, যা করার স্যার করেছেন। আমার কিছু বলার নেই।”
মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মেহেদি হাসান সংবাদকর্মীদের কাছে ঘটনার দায় অনেকটা হালকা করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন:
”তাঁরা সম্পর্কে জামাই-শ্বশুর, সামান্য গোলমাল হয়েছে। রাজেদুল ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে আমি ফাঁড়ির জাহাঙ্গীর ও আলমগীরকে পাঠিয়েছিলাম। তারা গিয়ে সমাধান করে রাতে তাকে (রাজেদুলকে) তাদের বাড়িতেই রেখে চলে এসেছে।”
তবে মোটরসাইকেল ও স্ট্যাম্পের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওসি ভিন্ন সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন:
”পরের দিন বেলা ১২টার সময় দাঁড়িয়ে থেকে স্ট্যাম্প ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তবে মোটরসাইকেল যেহেতু তাঁদের স্ট্যাম্প করে নেওয়া, সেটি তাঁদের বাড়িতে থাকবে? হ্যাঁ, মোটরসাইকেল এখন থানায় আছে। রাজেদুলকে এসে নিয়ে যেতে বলেন।”
উল্লেখ্য যে, রাজেদুলের স্ত্রী কর্তৃক দায়েরকৃত একটি যৌতুক মামলা (সিআর ৭২৩/২৫) বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে চলমান থাকা সত্ত্বেও, আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। বর্তমানে নিরুপায় রাজেদুল ইসলাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মহেশপুর আদালতে দণ্ডবিধির ৩৪১/৩২৩/৩৮৪/৩৬৫/৩৭৯/৩০৭/৫০৬(২) ধারায় একটি নালিশি পিটিশন দায়ের করেছেন।
একজন সাধারণ নাগরিক যেখানে বিপদে পড়ে পুলিশের কাছে আশ্রয় চেয়েও উল্টো লাঞ্ছিত হন, সেখানে জননিরাপত্তা আজ প্রশ্নের মুখে। সচেতন মহলের দাবি, আইনের রক্ষক হয়ে যারা আসামিদের সাথে হাত মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক। অন্যথায় পুলিশের ওপর থেকে জনগণের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে।





