চট্টগ্রামে ভয়ংকর অস্ত্র সিন্ডিকেটের জাল উন্মোচন, ডিবি ও থানা পুলিশের পৃথক অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র গোলাবারুদসহ ৪ সন্ত্রাসী গ্রেফতার
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম মহানগরীতে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ উত্তর এবং বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশের পৃথক অভিযানে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র গোলাবারুদ ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারসহ মোট ৪ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের ধরণ ও পরিমাণ বিশ্লেষণে একটি সুসংগঠিত অস্ত্র চক্রের কার্যক্রমের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পুলিশ কমিশনার সিএমপি’র নির্দেশনায় মহানগর গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের টিম নং ৩১ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এই তথ্য যাচাইয়ের জন্য ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ২২টা ২০ মিনিটে ড্রিমল্যান্ড আবাসিক এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযান চলাকালে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে মোঃ হাসান নামের এক সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তার দেহ তল্লাশি করে কোমরের পেছনে গোঁজা একটি ধারালো চাপাতি উদ্ধার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, তার কাছে আরও অস্ত্র মজুদ রয়েছে এবং সে নিয়মিতভাবে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ এপ্রিল গভীর রাতে হাটহাজারীর খন্দকিয়া রাজখান পাড়া এলাকায় তার ভাড়া বাসায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে ২টি দেশীয় তৈরি শটগান, ১টি একনলা বন্দুক, ২০টি তাজা কার্তুজ, একটি শটগানের ব্যারেল, ৩টি রিকয়েলিং স্প্রিং এবং ৩টি চাপাতি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত এসব সরঞ্জাম থেকে ধারণা করা হচ্ছে, শুধু অস্ত্র মজুদ নয়, বরং অস্ত্র তৈরির সঙ্গেও সে জড়িত ছিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মোঃ হাসান স্বীকার করে যে, সে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ভয়ভীতি সৃষ্টি, চাঁদাবাজি ও সহিংসতায় অংশ নিত। পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে পূর্বে চুরি, মারামারি ও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলা রয়েছে, যা তাকে একজন অভ্যাসগত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে।
অন্যদিকে একই সময়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশের একটি পৃথক অভিযানে আরও একটি সক্রিয় অস্ত্র চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লিংক রোড এলাকায় একটি সিএনজি গ্যারেজের সামনে অভিযান চালানো হলে নুর উদ্দীন সোহেল নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি খালি ম্যাগাজিন, ১৮টি পিস্তলের তাজা গুলি এবং ২টি চায়না রাইফেলের গুলি উদ্ধার করা হয়।
তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল জানায়, সে পিস্তলটি তাপস পালিত ওরফে শিমুল নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ক্রয় করেছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোতোয়ালী থানাধীন চেরাগী পাহাড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাপস পালিতকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকেও একটি বিদেশি পিস্তল এবং একটি খালি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে তাপস পালিত জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে যে, সে অস্ত্রটি দীপক কান্তি দে নামের আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন ওয়াজেদিয়া এলাকায় চেয়ারম্যান মার্কেটের সামনে থেকে দীপক কান্তি দেকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে ১০টি পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, এই তিনজন দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র ক্রয় বিক্রয়, সরবরাহ এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে নগরীতে সরবরাহ করত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধারকৃত অস্ত্রের ধরণ এবং সংখ্যার ভিত্তিতে বোঝা যাচ্ছে যে, এগুলো কোনো ছোটখাটো অপরাধের জন্য নয়, বরং বড় ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে বিদেশি পিস্তল ও চায়না রাইফেলের গুলি উদ্ধার হওয়া বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
এই ধারাবাহিক অভিযানের ফলে নগরীতে সক্রিয় একটি বড় অস্ত্র সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তারা আশঙ্কা করছেন, এই চক্রের আরও সদস্য এখনো সক্রিয় রয়েছে, যাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা আতঙ্কিত ছিলেন। পুলিশের এই সফল অভিযানে তারা কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। তবে তারা মনে করছেন, অবৈধ অস্ত্রের উৎস বন্ধ না করা গেলে এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি। এটি শুধু অপরাধ বাড়ায় না, বরং সামাজিক নিরাপত্তাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহ চেইন ধ্বংস করা অত্যন্ত জরুরি।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আরও অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে তা ভবিষ্যতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





