সম্পাদকিয়

আবেগ যখন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্র: মেনিপুলেশন ইমোশনাল

 

মরিয়ম ইয়াসির

আবেগের অপব্যবহার: নীরব এক মানসিক সহিংসতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা আমরা স্বাভাবিক বলে ধরে নিই। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, অনেক সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক অশান্তি, কর্মক্ষেত্রের দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক বিভাজনের পেছনে কাজ করে এক ধরনের নীরব মানসিক চাপ—যাকে বলা হয় ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন বা আবেগের অপব্যবহার। ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের আবেগ, কষ্ট, রাগ, অভিমান বা অসন্তোষকে এমনভাবে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন যে অপর ব্যক্তি নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করেন। অনেক সময় তিনি এমন ভুলের দায়ও নিজের কাঁধে তুলে নেন, যা আদৌ তার ছিল না। পরিবারে এর প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যখন আবেগকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস কমতে থাকে। মানুষ মনের কথা বলতে ভয় পায়, ক্ষোভ জমতে থাকে এবং একসময় সম্পর্কগুলো কেবল দায়বদ্ধতার ওপর টিকে থাকে, ভালোবাসার ওপর নয়। কর্মক্ষেত্রেও ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি আবেগগত চাপ সৃষ্টি করে নিজের স্বার্থ আদায় করতে চান, তাহলে কর্মপরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে। কর্মীরা মানসিক চাপে ভোগেন, উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবর্তে অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি হয়।
সমাজেও এর নেতিবাচক প্রভাব কম নয়। যখন মানুষ যুক্তি, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক সম্মানের পরিবর্তে আবেগকে ব্যবহার করে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভুল বোঝাবুঝি, বিভক্তি এবং অসহিষ্ণুতা বাড়তে থাকে। অন্যদিকে, যদি মানুষ ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন পরিহার করে এবং খোলামেলা ও সম্মানজনক যোগাযোগের চর্চা করে, তাহলে ব্যক্তি, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ আত্মবিশ্বাসী হয়, নিজের মতামত প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং মানসিক শান্তি লাভ করে। পরিবারে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা, সততা ও দলগত কাজের পরিবেশ গড়ে ওঠে। আর সমাজে গড়ে ওঠে সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সুস্থ মানবিক সম্পর্ক। আবেগ মানুষের স্বাভাবিক ও মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু সেই আবেগ যখন অন্যকে নিয়ন্ত্রণ বা অপরাধবোধে ভোগানোর অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। তাই সুস্থ সমাজ গঠনের স্বার্থে আমাদের প্রত্যেকের উচিত আবেগকে প্রকাশ করা, কিন্তু কখনোই তা অন্যের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া। কারণ প্রকৃত সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে নয়, বিশ্বাসে টিকে থাকে; আর প্রকৃত ভালোবাসা অপরাধবোধে নয়, সম্মান ও আন্তরিকতায় বিকশিত হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সম্পাদকিয়

বদলে যাচ্ছে কৃষি, ঝুঁকিতে স্বাস্থ্য

There are many variations of passages of Lorem Ipsum available but the majority have suffered alteration in that some injected
Uncategorized সম্পাদকিয়

সম্পাদকের কথা

There are many variations of passages of Lorem Ipsum available but the majority have suffered alteration in that some injected