সম্পাদকিয়

কর্ণফুলী

— কাজী ফারহান হায়দার

ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে,
অভাগিনীর দুঃখের কথা কইও বন্ধুরে।
ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে…”

কর্ণফুলী একটি নদীর নাম, কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটেছে। গানের কথার মতো এ অঞ্চলের আবেগ, ভালোবাসা, সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারা বহন করে নিতে কর্ণফুলীর বহমানতা যেন জীবনের জয়গানই গেয়ে গেছে বছরের পর বছর। কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের নদী গুলোর মধ্যে অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ নদী। ভারতে মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে সর্পিলাকারে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। বিভিন্ন উৎস হতে প্রাপ্ত তথ্য মতে কর্ণফুলী নদী মিজোরামের মিজো ভাষায় খাওৎলাং তুইপুই যার অর্থ পশ্চিম নদী এবং চাকমা ভাষায় বোরনাং যার অর্থ বড় নদী। কর্ণফুলী নদী ভারতের মিজোরাম প্রদেশের মমিত জেলার শৈতা গ্রাম লুসাই পাহাড় হতে উৎপত্তি হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য বাংলাদেশ অংশে প্রায় ২৭০ কি.মি৷ রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার থেগা নদীর মোহনা বা ঠেগামুখ হতে বড় হরিনার মুখ পর্যন্ত ৬ কি.মি কর্ণফুলী ভারত বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণ করেছে। পদ্মা নদীর পরে এটিই বাংলাদেশের অন্যতম প্রবাহমান নদী। এ নদীর উৎপত্তি স্থলে চারটি শাখা নদী কাসালং, মাইনিং, রীকং ও বেদিঁ নদীর পানির মিলিত স্রোত কর্ণফুলীতে এসে মিশেছে। ইছামতি, হালদা উপনদী কর্ণফুলীর নদীর সাথে মিলিত হয়ে কর্ণফুলীর পানির প্রবাহে গতি সঞ্চার করেছে।
কর্ণফুলি নদীর নাম নিয়ে অনেক প্রচলিত লোককথা আছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কর্ণফুলী’ কাব্য হতে নামকরণ সম্পর্কে আরো স্পষ্ট হওয়া যায়। তিনি লিখেছেন,
“ওগো ও কর্ণফুলী তোমার সলিলে পড়েছিল কবে কার কানফুল খুলি
তোমার স্রোতের উজান ঠেলিয়া কোন তরুণী, কে জানে
সাম্পান নায়ে ফিরেছিল তার দয়িতের সন্ধানে।
আনমনে তার খুলে গেলো খোঁপা, কান- ফুল গেল খুলি।
সে ফুল যতনে পড়িয়া কর্ণে, হলে কি কর্ণফুলী? “
কথিত আছে যে, আরাকানের এক রাজকন্যা চট্টগ্রামের এক পাহাড়ি রাজপুত্রের প্রেমে পড়েন। এক জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে তারা দুইজন এই নদীতে নৌভ্রমণ উপভোগ করছিলেন। নদীর পানিতে চাঁদের প্রতিফলন দেখার সময় রাজকন্যার কানে গোঁজা একটি ফুল পানিতে পড়ে যায়। ফুলটি হারিয়ে কাতর রাজকন্যা সেটা উদ্ধারের জন্য পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু প্রবল স্রোতে রাজকন্যা ভেসে যান, তার আর খোঁজ পাওয়া যায় নি। রাজপুত্র রাজকন্যাকে বাঁচাতে পানিতে লাফ দেন, কিন্তু সফল হন নি। রাজকন্যার শোকে রাজপুত্র পানিতে ডুবে আত্মাহুতি দেন। এই করুণ কাহিনী থেকেই নদীটির নাম হয় কর্ণফুলী।
এছাড়া কিছু কিছু ইতিহাসবিদ করনফোল থেকে কর্ণফুলী নামটি এসেছে বলে ধারণা করেন। তাদের মতে আরব বনিকরা চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল থেকে লবঙ্গ নিয়ে রপ্তানি করতো। আরবিতে লবঙ্গকে করণফোল বলা হয়। একদিন করণফোল বোঝাই জাহাজ নদীতে ডুবে যায়,তাই এই ঘটনা থেকে করণফোল নামে অভিহিত করা হয় যা পরবর্তীতে লোকমুখে কর্ণফুলী নামে পরিচিত হয়।
ঔপনিবেশিক আমলে মিজোরামে যাওয়ার জন্য ব্রিটিশরা, আরব ব্যবসায়ী ও ধর্ম প্রচারকগন এই পথ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম থেকে মিজোরামের তলবুং যেতেন, তলবুং মিজোরামের লংলেই জেলায় অবস্থিত।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কর্ণফুলী নদী কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। চট্টগ্রাম বন্দর ও কর্ণফুলী নদীদ মোহনায় পাকিস্তান বাহিনী নৌ-পথে অস্ত্র ও রসদ আনার জন্য এই নদীপথ ব্যবহার করতো। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র রক্ষা, গুপ্তচরবৃত্তি এবং অতর্কিত হামলার জন্য নদীর নৌ-পথ ও আশেপাশের এলাকা ব্যবহার করে শহরের ভেতর যাতায়াত করতো। কর্ণফুলী নদী এবং চট্টগ্রাম বন্দরের আশেপাশে নৌ-কমান্ডেরা পাকিস্তানি জাহাজে মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অচল করে দিতো। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাহাড়ের আনোয়ারা ও পটিয়ার যোদ্ধারা শহরের প্রান্তের অভয় মিত্র ঘাট, ওমর আলী মাতব্বর ঘাট ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সংযোগ রক্ষা করে অস্ত্র, মালামাল পরিবহন করত এবং নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান করত। গেরিলা যোদ্ধাদের চলাচলের প্রধান মাধ্যম ছিল কর্ণফুলী নদী ও এর সংযুক্ত খাল গুলো।
কর্ণফুলী নদী ও তার মোহনায় ধ্বংস প্রান্ত পাকিস্তানি জাহাজ মাইন অপসারণ করে চট্টগ্রাম বন্দর চালু করতে সোভিয়েত বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে। সেই কাজে কর্মরত থাকা অবস্থায় দুর্ঘটনায় ১৩ জুলাই ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত নৌসেনা ইউরি রেদকিন নিহত হন, তার দেহ বাংলাদেশ নেভাল একাডেমিতে সমাধিস্থ করা হয়, সেখানে তার একটি স্মৃতি স্তম্ভ আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অপারেশন জ্যাকপট পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্ণফুলী নদী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ১৯৭১ সালের আগষ্ট মাসে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নৌ-কমাডো দ্বারা পরিচালিত অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর দুঃসাহসিক ও সফল একটি আত্মঘাতী অভিযান হলো অপারেশন জ্যাকপট। ১৫ আগস্ট রাত ১২টার পর ও ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা ২৬ টি জাহাজ মাইন ব্যবহার করে ধংস করা হয়েছিল। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে থাকা পাকিস্তানি জাহাজ এমভি হরমুজ এবং এমভি আল-আব্বাস মাইন বিস্ফোরণে তলিয়ে যায় এই অভিযানে নৌ কমান্ডোরা কর্ণফুলীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত আনোয়ারা ও পটিয়ার তীরবর্তী অঞ্চল ব্যবহার করেন।
কর্ণফুলী নদীর উপর অবস্থিত কালুরঘাট সেতু ১৯৩০ সালে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক রেলসেতু যা ডাবল লাইনের রেল কাম সড়ক সেতু হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা চট্টগ্রামের দক্ষিনাঞ্চল ও কক্সবাজার কে সড়ক পথে সংযুক্ত করেছে। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ এই সেতুর কাছে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিলো। কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত দ্বিতীয় সেতুটি নেদারল্যান্ডস এর সহোযোগিতায় নির্মিত হয়েছিলো যা ষ্টীল পাটাতন ও কাঠের তৈরি ছিল। এ সেতুটি মূলত নেদারল্যান্ডের ইস্টান সেল্ট ব্রিজের একটি ব্যবহৃত অংশ বাংলাদেশে এনে স্থাপন করা হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে ডিসেম্বর মাসে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বাসীর দীর্ঘদিনের দাবীর পেক্ষিতে ২০০৬ সালে কুয়েত সরকারের সহযোগিতায় তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর কাজ শুরু হয় এবং ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তা যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। কর্ণফুলী শুধু একটি নদীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এটি এ অঞ্চলের সভ্যতার উন্নতিও ক্রমবিকাশে ভূমিকা রেখে চলছে। কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে জীবন-জীবিকার সাথে সাহিত্য, সংস্কৃতির উৎসবের চমৎকার মেলবন্ধন গড়ে উঠেছে, কর্ণফুলীর তীরে গড়ে উঠেছে শিল্প কলকারখানা যেগুলোর অনেকগুলো নামের সাথে কর্ণফুলী নাম জড়িয়ে আছে। চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত কর্ণফুলী পেপারস মিল, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার, কর্ণফুলী স্যুজ ইন্ডাস্ট্রিজ, কর্ণফুলী ইপিজেড অন্যতম। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ এর মত ছোট বড় শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠেছে। এই শিল্প কলকারখানা দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শিল্প কলকারখানা গুলো নিজস্ব জেটি ও ঘাট ব্যবহার করে পণ্য আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে অবদান রেখে চলছে। কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত বাঁধ দেওয়া হয় ১৯৬২ সালে যেটির মাধ্যমে ২৩০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে, এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বাঁধ ও একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুতের চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ অংশও যোগান দিচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর পানি ব্যবহার করে ওয়াসা পানি শোধনাগার প্রকল্প হাতে নিয়েছে জাইকার সহযোগিতায় যা দিয়ে চট্টগ্রাম শহরের পানি সরবরাহের চাহিদা মিটানো হচ্ছে, পাশাপাশি গভীর নলকূপের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে এসব প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় খাতুনগঞ্জ বাংলাদেশের তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম ও প্রাচীন পাইকারি ভোগ্য পণ্যের বাজার হিসেবে গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম শহরে চাক্তাই খালের পাশে কর্ণফুলী নদীর তীরে এটি গড়ে উঠেছে, প্রাচীনকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পণ্যবাহী জাহাজ মালামাল খালাসের ও পরিবহনের জন্য চাক্তাই খালের ভিতরে গিয়ে নোঙ্গর করত জাহাজ ও বড় বড় নৌকা গুলো, সেই সময় থেকে এখানে ব্যবসা বাণিজ্য গড়ে ওঠে যা ২০০ বছরের পুরনো বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কর্ণফুলী নদীর কোল ঘেঁষে চাক্তাই খালের সাথে লাগানো আরো একটি বাণিজ্যিকেন্দ্র হচ্ছে আসাদগঞ্জ, এখানে চাল ও শুটকি মাছ কেনাবেচার জন্য বিখ্যাত। এছাড়া এখানে কাঁচা চামড়ার গুদাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা চামড়া রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর তীরে মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার এসবের নোঙ্গর করার জন্য ফিশারি ঘাট, মাঝির ঘাট, সদরঘাট উল্লেখযোগ্য। এসব ঘাটে মাঝিরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার পর ট্রলার নিয়ে আসে এবং সেখান থেকে দেশের সব মাছের আড়তে সরবরাহ হয়। সদরঘাট দেশের অন্যতম প্রধান নদী বন্দরও, এই নদী বন্দর থেকে সারাদেশে যাত্রী পরিবহন,পণ্য আনা- নেওয়ার কার্যক্রম সম্পাদিত হয়, পাশাপাশি আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে এই ঘাটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী যেমন পাথর, বালি, সিমেন্ট, টাইলসহ বিভিন্ন উপকরণ বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে যা সদর ঘাটের বিভিন্ন ডিপোতে খালাস করা হয়, যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে কর্ণফুলী নদী ও এর শাখা নদী গুলোতে (যেমন চেঙ্গী নদী) চাকমা ত্রিপুরা মারমা সম্প্রদায়ের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী ( বৈসুক-সংগ্রাই-বিজু) উৎসবের সময় নদীতে ফুল ভাসিয়ে থাকে, যা “ফুলবিুজু” নামে পরিচিত পেয়েছে।
যাত্রী পরিবহন ও মালামাল পরিবহনের জন্য কর্ণফুলী তীরে কালুরঘাট থেকে শুরু করে অনেকগুলো ঘাট মানুষ ব্যবহার করে। উল্লেখযোগ্য ঘাট গুলো হলো অভয় মিত্র ঘাট, ওমর আলী মাতব্বর ঘাট, বাংলা বাজার ঘাট, ফিরিঙ্গি বাজার ঘাট, ফিশারি ঘাট, মাঝির ঘাট, নতুন ব্রিজ ঘাট, পুরাতন ব্রিজ ঘাট, শিকলবাহা ঘাট, ১১ নম্বর ঘাট, ১২ নম্বর ঘাট এবং ১৫ নম্বর ঘাট। এসব ঘাটে পারাপারের জন্য প্রচুর নৌকা/ সাম্পান আছে। নৌকা / সাম্পানের মাঝির সংখ্যা ও কোন অংশে কম নয়, ঘাট ভেদে ২০০ থেকে ৩০০ জন মাঝি আছেন যারা নৌকা / সাম্পানের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের প্রধান উপজীব্য বিষয় কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে মাছ ধরা মালামাল পরিবহন ও যাত্রী পরিবহন করা। এ সকল ঘাটের সাম্পানের মাঝিরা কর্ণফুলী নদীর প্রাণ চাঞ্চল্য ধরে রেখেছেন। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের কর্মযজ্ঞ চলতে থাকে, কর্ণফুলী নদীর মাঝিদের সমন্বয়ে অনেকগুলো সামাজিক সংগঠন গড়ে উঠেছে যেগুলো সাম্পান সমিতি নামে পরিচিত। প্রায় চার থেকে পাঁচটি স্বীকৃত সাম্পান সমিতি আছে কর্ণফুলী ব্রীজঘাট অংশে, এই সাম্পান সমিতির মাধ্যমে তারা নৌকা পরিচালনা করেন। পাশাপাশি কর্ণফুলীর তীর ঘেষে গড়ে উঠেছে অনেক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এসব সংগঠনের সাথে জড়িত। এসব সংগঠন বিভিন্ন দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি দেশের সকল ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কর্ণফুলী সাম্পান সমিতি ও সামাজিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এখানে চার দিনব্যাপী চাটগাঁইয়া সাংস্কৃতিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়, মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে সাম্পান সমিতির সাম্পান খেলা এবং কর্ণফুলী নদী বাঁচাও সাম্পান র‍্যালি। কর্ণফুলী নদী বাঁচাও র‍্যালিতে দেশের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, নদী গবেষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে কর্ণফুলীকে বাঁচিয়ে রাখার প্রত্যয় গ্রহনের মাধ্যমে জীবনের জয়গান গেয়ে যান। আমরা আশা রাখি কর্ণফুলী হজার হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকুক, আমাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখে জীবনের প্রবাহমান গতিধারাকে প্রবাহিত করে।
আমরা চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর সাম্পানের ঐতিহ্য যদি দেখি প্রথমেই আমাদের চোখে সাম্পান নিয়ে বিভিন্ন গল্প ও লোকগাঁথা। ১৯৪৬ সালে কবি ওহীদুল আলম “কর্ণফুলীর মাঝি” নামে একটি কাহিনি কাব্য রচনা করেন। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ১৯৬২ সালে রচনা করেন উপন্যাস “কর্ণফুলী”। এছাড়া চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অনেক জনপ্রিয় গান রচিত হয়েছে কর্ণফুলীকে ঘিরে, তার মধ্যে অন্যতম হল- “ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত
লুসাই পাহাড়ত্তুন লামিয়েরে
যার গৈ কর্ণফুলী” ।
সাম্পানের মাঝিদের নিয়ে “সাম্পান ওয়ালা” ছবিতে একটি গান খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করে-
“ওরে সাম্পান ওয়ালা
তুই আমারে করলি দিওয়ানা” ।
সাম্পান ওয়ালা নাটক থেকে পরবর্তীতে সাম্পান ওয়ালা সিনেমা তৈরি হয়, যা দেশে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে শত শত গান, কবিতা, রচিত হয়েছে। কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে যেমন- ব্যবসা-বানিজ্যের প্রসার ঘটেছে তেমনি শিল্প-সাহিত্য, সাংস্কৃতিক বিকাশমান ধারা নদীর ধারার মতো গতিশীল ভাবে প্রবাহিত হয়ে যায় প্রধান চালিকা শক্তি কর্ণফুলী।
কর্ণফুলী নদীর ঐতিহ্য সাম্পান কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তাদের মনোগ্রামে স্থান দিয়েছেন যেটা হাজার হাজার বছর ধরে ঠিকে থাকবে বলে প্রত্যাশা করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোর মূলকাঠামোটি ঐতিহ্যবাহী সাম্পানের সামনের অংশের আদলে তৈরি যা এই অঞ্চলের ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন জেলেরা। নদীতে আগের মতো মাছের আধিক্য না থাকলেও মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার ব্যবহার করে নদী ও সাগরে জেলেরা মাছ ধরতে যায়। কর্ণফুলী নদীতে মিঠা ও লবনাক্ত পানির মাছ বিপুল পরিমাণে পাওয়া যেত। এর মধ্যে মিঠা ও লোনা পানির মাছের ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি আছে। কর্ণফুলীর মোহনায় লোনা পানির মাছ পাওয়া যেত। পানির অতিরিক্ত দূষণের ফলে মিঠা পানির আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে দিনের পর দিন।
অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চালনে কর্ণফুলী নদীর ভূমিকা অপরিসীম। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য জেটি হাউস, এসব জেটি হাউস সরাসরি পণ্য আমদানি রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি বৈদেশিক আমদানি রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কন্টেইনার টার্মিনাল গড়ে উঠেছে কর্ণফুলীর ঘেষে। কর্ণফুলী নদীর তীরে দেশের বড় জ্বালানি তেলের ডিপোগুলো গড়ে উঠেছে সহজে তেল পরিবহনের সুবিধার্থে। দেশের জ্বালানি চাহিদা মিটানোর ক্ষেত্রে ও তেলের সংকট মোকাবেলায় এসব ডিপোগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কর্ণফুলী নদীর বুকে গড়ে উঠে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। এ বন্দর প্রাকৃতিকভাবে হাজার বছর ধরে চলমান আছে। কর্ণফুলী নদীর ভূ-প্রকৃতিগত অবস্থানের কারণে কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে দেশের প্রধান বন্দর প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন দেশের পরিব্রাজকরা যেমন ইবনে বতুতা, মার্কো পোলো তাদের ভ্রমণ বর্ণনায় চট্টগ্রাম বন্দরকে লিখেছেন। ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে ইংরেজ ও দেশীয় ব্যবসায়ীরা বার্ষিক এক টাকা সেলামির বিনিময়ে নদীতে কাঠের জেটি নির্মাণ করেন যা পরে ১৮৬০ সালে প্রথম দুটি অস্থায়ী জেটি নির্মিত হয়। ১৮৭৭ সালে পোর্ট কমিশনার গঠনের মাধ্যমে এ বন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় যা পরবর্তীতে ১৮৯৯-১৯১০ সালের মধ্যে পোর্ট কমিশনার ও আসাম কোটাঁল রেলওয়ে যুক্ত হয়ে চারটি জেটি নির্মাণ করে। ১৯১০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে রেলওয়ের সংযোগ সাধিত হয় যা ১৯২৬ সালে মেজর পোর্ট হিসেবে ঘোষিত হয়। ১৯৭৬ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
এছাড়া কর্ণফুলী নদীর তীরে স্থাপিত হয়েছে সরকারি মেরিন একাডেমি, মেরিন ফিশারিজ একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠান, কর্ণফুলী নদী ও সাগরের নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও জানমালের নিরাপত্তার জন্য নৌবাহিনী কোস্টগার্ডের জন্য পৃথক স্থানে নিরাপত্তা সরঞ্জামসহ নিরাপত্তা জাহাজ নৌকা ও অফিস করা হয়েছে। এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এর ফলে নৌ পথে চলাচলের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কর্ণফুলী নামটি ব্যবহার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, শিল্প-কলকারখানার পাশাপাশি নদীর তীর ঘেসে পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে কর্ণফুলী উপজেলা এবং নদীর তীরবর্তী গ্রাম-ইউনিয়নের সমন্বয়ে কর্ণফুলী থানা গঠিত হয়েছে, যা মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা-নির্বাহ, বসবাসর উপযোগী করে তুলেছে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলকে।
কর্ণফুলী নদীর তীরে সরকারিভাবে গড়ে উঠেছে শিকল বাহা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার সহ অনেক প্রতিষ্ঠান। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ও দীর্ঘতম সুরঙ্গ পথ কর্ণফুলী টানেল, যার দৈর্ঘ্য ৩.৩২ কিলোমিটার। এটি চট্টগ্রাম শহরের পতেঙ্গা ও দক্ষিণের উপজেলা আনোয়ারাকে সংযুক্ত করেছে। এটির মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহর ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের দূরত্ব কমিয়ে আনবে। ২৮ অক্টোবর ২০২৩ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়।
কর্ণফুলী নদীকে বাংলাদেশের লাইফ লাইন বলা হয় এটি বাংলাদেশের অর্থকারী নদী। কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্প কলকারখানা। শিল্প কলকারখানাগুলোর অধিকাংশই ETP নেই ,ফলে কর্ণফুলী নদীর দূষণ দিন দিন বেড়ে চলছে। কর্ণফুলী নদী দূষণের প্রধান কারণ গুলো যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাই প্রায় ৮০০~ ১০০০ ছোট বড় শিল্প কারখানা, অনেকগুলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। এছাড়াও চট্টগ্রাম শহরের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে দৈনন্দিন বর্জ্যের পরিমাণও বেড়ে গেছে যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কর্ণফুলী নদীতে মিশেছে। সিটি কর্পোরেশনের ৩০~ ৪০ টি পয়-নিষ্কাশন, ড্রেন, খাল কর্ণফুলীতে এসে মিশেছে । চাক্তাই মাঝিরঘাট, ফিরিঙ্গি বাজার এলাকার খাল গুলো সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে যুক্ত। কর্ণফুলী নদীতে যুক্ত হচ্ছে ভারী ধাতু যেমন Cu, Ni, Fe, Cd, Pl, Mn, Co, Cr, Ca বিভিন্ন শিল্প কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য থেকে। কর্ণফুলী নদীর সাথে সংযুক্ত খাল গুলোতে প্রতিনিয়ত অপরিশোধিত বর্জ্য এসে মিশে নদীকে দূষণ করেছে। সবচেয়ে দূষিত খালের মধ্যে চাক্তাই খাল অন্যতম। এছাড়া জামাল-খান-খাল, মির্জাখাল, হিজড়া খাল, সৈনারটেক খাল, শিকলবাহা খাল, মহেশ খাল ও বহদ্দারহাট খাল অপরিশোধিত বর্জ্য জমা হয়ে পানির সাথে মিশে কর্ণফুলীতে এসে পড়তেছে প্রতিনিয়ত। কর্ণফুলী নদীর দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কর্ণফুলী নদীর পানির DO (DISSOLVED OXYGEN) এর স্বাভাবিক মাত্রা ৫~৮ mg/L এর চেয়ে কমে যাচ্ছে স্থানভেদে । পানি দূষণ, জৈব পদার্থ , তেল দূষণের কারণে পানির DO কমে যাওয়ার ফলে জলজ প্রাণী বেঁচে থাকা হুমকির মুখে পড়েছে । বর্তমানে কর্ণফুলী নদীতে শুশুক এর উপস্থিতি নাই বললেই চলে। সুস্থ পরিবেশ ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য পানির DO গুরুত্বপূর্ণ । বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত DO মাত্রা ৪~৬ mg/L । কর্ণফুলী পানির BOD (Biochemical Oxygen Demand) এর পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অতিরিক্ত দূষণের ফলে BOD এর পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে যা নদীর পানি পানির জন্য পরিশোধন করার উপযোগিতা হারাচ্ছে। পাশাপাশি মাছের আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাছ ডিম পাড়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে না ।
কর্ণফুলী নদীর পানিতে শিল্প বর্জ্য দূষণের ফলে পানির COD বেড়ে চলেছে। জৈব ও অজৈব অদ্রব্যগুলো পানিতে মিশে পানির COD পরিমাণ বাড়িয়ে তুলছে যার ফলে পানিতে অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, ফলশ্রুতিতে মাছ ও জলজ প্রাণী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কর্ণফুলী নদীর পানির TDS (TOTAL DISSOLVED SOLIDS) মাত্রা বেশি পাওয়া যাচ্ছে । কোন কোন স্থানে সেটি ৯০০ mg/L পাওয়া যাচ্ছে এর উপরে পাওয়া যাচ্ছে যা পানির পানীয় জলের ব্যবহারের জন্য আদর্শ TDS মাত্রা ৩০০ mg/L এর চেয়ে বেশি। ব্যবহারযোগ্য পানির স্বাভাবিক মাত্রা ৩০০ ~ ৬০০ mg/L TDS হলো গ্রহণযোগ্য। কিন্তু নদীর পানি অত্যাধিক দূষিত হচ্ছে বলে TDS এর মাত্রা বেশি পাওয়া যাচ্ছে ।পানি পরিশোধনের জন্য TDS এর মাত্রা ১৫০~ ৩০০ হলে ভালো । শিল্প কল- কারখানাগুলোতে ETP ব্যবহার না করার কারণে কিছু কিছু এলাকায় যেমন জুট রেলী ঘাট এবং ইস্পাহানি জুট খাল এরিয়াতে পানির pH এর মাত্রা স্বাভাবিক মানের চেয়ে বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
কালুরঘাট সেতু নির্মানের পর কর্ণফুলী নদীর গতিপথ পরিবর্তন হতে থাকে চর জেগে উঠে। সবচেয়ে বড় চর হচ্ছে চর বাকলিয়া। নদীতে ড্রেজিং না করায় ডুবোচরের সংখ্যা বেড়ে চলেছে যা নদীর নাব্যতা সংকট তৈরী করছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি শুকিয়ে গেলে ভাটার সময় নদীর বুক যখন চরে জেগে উঠে তখন অনেকটা পথ জুড়ে নৌ-যান ও সাম্পান চলাচল করতে হয়।
এছাড়া কণূফুলী নদীর তীরবর্তী ৮১ প্রজাতির উদ্ভিদ বিলুপ্তির ঝুকিতে রয়েছে। দূষন রোধে ব্যবস্থা না নিলে আরও ৬১টি প্রজাতির উদ্ভিদ বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গবেষকরা কর্ণফুলী নদীর তীরে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছেন।
কর্ণফুলীর উপর অনেক অবিচার হয়েছে। নিপীড়ন, অত্যাচার অবিচারেওে কর্ণফুলী আজ বিপন্ন একটি নদী। দেশের স্বার্থ পরিবেশ প্রান-প্রকৃতি, উদ্ভিদ বৈচিত্র বাচিয়ে রাখার স্বার্থে কর্ণফুলী বাঁচাতে হবে দূষণের হাত থেকে।
কর্ণফুলী নদী কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গাঁ পর্যন্ত এলাকায় দখল অব্যহত রয়েছে। নদীর জায়গা দখল করে ঘর-বাড়ী, দোকান-পাঠ বস্তি, কলকারখানা তৈরী করার কারনে কর্ণফুলী নদীর তীরের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়েছে এবং নদীর পাড়ে মুক্ত বাতাসে মানুষের চলাফেরা ব্যাহত হয়েছে। নদীর সীমানা নির্ধারনের ক্ষেত্রে ভরা জোয়ারে পানির শেষ সীমানা থেকে দুই পাশে ৪০-৫০ মিটার নদীর অংশ বলে বিবেচিত হয় কিন্তু নদীর দুই তীর দখলের কারনে সেটি উম্মুক্ত রাখা সম্ভব হয়নি।
আমাদের দেশের প্রয়োজনে কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হবে দখল ও দুষণ থেকে। কর্ণফুলী দেশের অর্থকরী নদী। এ নদী বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বেঁচে থাকবে। কর্ণফুলী নদীকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন এখন সময়ের দাবী। কর্ণফুলীকে বাঁচাতে করনীয় নিয়ে এবার আলোচনা করা যাক।
যেসব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায় তাহলো: –
১। কর্ণফুলীর নদীর তীরে অবস্থিত সকল ছোট-বড় শিল্প-কলকারখানা বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ETP স্থাপন করা।
২। কর্ণফুলী তীরের অবৈধ দখল মুক্ত করতে হবে। ভরা জোয়ারে প্রান্তসীমা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত উম্মুক্ত করতে হবে।
৩। নদীর পানির DO, BOD, COD, TDS, pH নিয়মিত পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪। সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে নদীর পানি থেকে বর্জ্য আহরন করে নদীর পানির প্রবাহ ঠিক রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫। কর্ণফূলী নদীর সাথে সংযুক্ত নালা, খাল গুলোকে দূষণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৬। সিটি কর্পোরেশন ওয়াসা চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি এবং সরকারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কর্ণফুলীর দখল ও দূষণের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৭। কর্ণফুলী নদীর পানির প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য ডুবো চর অতিরিক্ত পলি অপসারনের জন্য নিয়মিত Capital ড্রেজিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।
৮। নদীর পানির লবনাক্ততা যাতে না বাড়ে এবং মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বসবাসের উপযোগী পরিবেশ যাতে বজায় থাকে সে লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপে নিতে হবে।
৯। কর্ণফুলী নদীতে চলাচলকারী নৌ-যান গুলোর নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা করতে হবে। মাছ ধরা নৌকা-ট্রলার যাথে সু-শৃংঙ্খল ভাবে অবস্থান ও চলাচল করে তার ব্যবস্থা নিতে হবে।
১০। উদ্ভুদ্ধ করন প্রচারনা চালাতে হবে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যাতে সচেতনতা তৈরী হয় মানুষের মধ্যে কর্ণফুলীতে দখল, দূষণ, বর্জ্য ফেলা থেকে মুক্ত হয়।
১১। কর্ণফুলীকে রক্ষার জন্য স্বল্প, মধ্যম, দীর্ঘ মেয়াদী জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে।
১২। ভূ-রাজনৈতিক ও দেশের নিরাপত্তার কৌশলগত দিক বিবেচনায় কর্ণফুলী নদীর গুরুত্ব অনুধাবন করে এ নদীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নদীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সমন্বয়ে ত্রিমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সম্পাদকিয়

বদলে যাচ্ছে কৃষি, ঝুঁকিতে স্বাস্থ্য

There are many variations of passages of Lorem Ipsum available but the majority have suffered alteration in that some injected
Uncategorized সম্পাদকিয়

সম্পাদকের কথা

There are many variations of passages of Lorem Ipsum available but the majority have suffered alteration in that some injected