পানির ব্যবহার এবং আগামীর ভাবনা
কাজী ফারহান হায়দার
পানির ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে জানতে হবে পানি কি এবং পানির গঠন কি?
পানি হল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দ্বারা গঠিত বর্ণহীন স্বাদহীন তরল যা পৃথিবীর জীবের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য উপাদান তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি পরিবহন, বর্জ্য নিষ্কাশনে সাহায্য করে।
পানির রাসায়নিক গঠনঃ পানির এক একটি অনু দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণুর সমন্বয়ে সমযোজী বন্ধন গঠন করে যার সংকেত H2O।
প্রাকৃতিক পানির প্রধানত চারটি উৎস হতে পাওয়া যায়
ক) বৃষ্টির পানি
খ) ভূ-পৃষ্ঠের পানি (নদী-হ্রদ, পুকুর বা খালের পানি)
গ) ভূ-গর্ভস্থ পানি
ঘ) সমুদ্রের পানি।
জীবনের জন্য পানি অপরিহার্য, পানি ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়, তাই পানির অপর নাম জীবন বলা হয়। পৃথিবীর বর্হিভাগ পৃষ্ঠের প্রায় ৭১ শতাংশ পানি পরিবেষ্টিত। জীবের ওজনের দুই তৃতীয়াংশ ও বেশি পানি দ্বারা গঠিত। জনসংখ্যার বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষি, শিল্পের প্রসারণের ফলে পানির শোষণ ও বাধাহীন অপচয়ের ফলে আজ পানি সম্পদ হুমকির সম্মুখীন। মানুষের সৃষ্ট অদূরদর্শী কার্যকলাপের কারণে পানির ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। দূষণ এবং অপচয়ের কারণে শারীরিক সুস্থতার জন্য এবং আমাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য সকল পর্যায়ে পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দূষিত পানি পান করার ফলে জীবানু ঘটিত সংক্রমণে পানিবাহিত রোগে অনেক এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে এমন উদাহরণের পাশাপাশি উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় পানি সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। উন্নত বিশ্বে বর্তমানে পানি বাহিত রোগ নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশে পানিবাহিত রোগ নির্মূল হয়নি এখনো, পানি বাহিত রোগের প্রকোপ রয়ে গেছে এখনো, যা আমাদের বিশুদ্ধ পানির ব্যবহারের উপযোগিতাকে আরো বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ভূপৃষ্ঠের যে অংশ তরল ও কঠিন পানি দ্বারা আবৃত থাকে তাকে বারিমণ্ডল হিসেবে অভিহিত করা হয়। সমুদ্র, মহাসমুদ্র, নদ-নদী, খাল, পুকুর, হ্রদ, মেরুপ্রদেশীয় বরফ ঢাকনা ও হিমবাহ মিলে বারিমন্ডল গঠিত। এছাড়া ভূগর্ভেও বায়ুমণ্ডলে বাষ্পাকারে যে পানি আছে তাও বারিমন্ডলে অন্তর্ভুক্ত। ভূপৃষ্ঠের মোট যে আয়তন তার প্রায় ৭১% তরল ও কঠিন পানি দ্বারা আবৃত। পানি রাশির বন্টন যদি হিসাব করা হয় তাহলে দেখা যায় –
সমুদ্র ও মহাসমুদ্র ৯৭ শতাংশ
ভূগর্ভ, হ্রদ,পুকুর, নদনদী, খাল ২ শতাংশ
তুষারস্তূপ, হিমবাহ ও বায়ুমন্ডল ১ শতাংশ ।
তরল পানি রাশির ৯৮% প্রায় সম্পুর্ণ অংশ সমুদ্র ও মহাসমুদ্র ধারণ করে কিন্তু উক্ত পানি লবণাক্ত হওয়ার কারণে ব্যবহারের উপযোগী নয়, অন্যান্য উৎস থেকে যে সামান্য তরল পানি পাওয়া যায় তা ১% এর ও কম যা মানুষ দৈনন্দিন প্রয়োজনে ব্যবহার করে।
পানির গলনাঙ্ক 0°C (সেলসিয়াস) এবং স্ফুটনাংক ১০০° C (সেলসিয়াস)
পানি একটি পোলার যৌগ, প্রায় সকল প্রকার পদার্থ এতে কম বেশি দ্রবীভূত হয়,এজন্য পানিকে উৎকৃষ্ট দ্রাবক বলা হয়। পানির এই গুনের কারণে পানির মাঝে যেসব জৈবিক প্রক্রিয়া ঘটে তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি যেমন সহজে জীবের কাছে পৌছাতে পারে, জৈবিক প্রক্রিয়া থেকে নিঃসৃত বর্জ্য ও তেমনি জীবের কাছ থেকে সহজে দূরে যেতে পারে।
পানির তাপধারণ ক্ষমতা উচ্চবলে জলজ প্রাণীকে তাপীয় বা শৈত্য কোন প্রকার অবস্থায় শিকার হতে হয় না ফলে রাত ও দিনের মাঝে বা শীত ও গ্রীষ্মের মাঝে পানির তাপমাত্রায় তেমন কোন পরিবর্তন ঘটে না।
যেকোনো পদার্থের মত পানীয়ও যত শীতল হয় তার ঘন আয়তন তত কমে যায়, পানি ৪°C তাপমাত্রার কাছাকাছি গেলে এর সংকোচন বন্ধ হয়ে যায়। পানির তাপমাত্রা ৪°C এর উর্ধে যত বৃদ্ধি পায় তত তার ঘনত্ব কমতে থাকে। 0°C তাপমাত্রার পানি বরফে পরিনত হওয়ায় পানির ঘন আয়তন বাড়তে থাকে।
বরফের ঘনত্ব বেশি হলেও পানির ঘনত্বের তুলনায় তা কম হওয়ায় বরফ পানিতে ভাসে। বরফ পানিতে ভেসে থাকে বলে জলজ প্রাণীর বরফে বেঁচে থাকা সম্ভব হয় বিশেষত শীত প্রধান অঞ্চলে।
pH একটি জলীয় দ্রবণের অম্লীয়/ক্ষারীয় অবস্থা নির্দেশ করে। ২৫°C তাপমাত্রায় জলীয় দ্রবণের pH=৭.০০ হলে দ্রবণটি নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়, pH < ৭ হলে দ্রবণটি অম্লীয় এবং pH > ৭ হলে তা ক্ষারীয়।
বিশুদ্ধ পানির pH তাই ৭.০০ ।
প্রাকৃতিক পানিতে যেসব প্রাণী বাস করে তাদের মাঝে মাছ অন্যতম। মাছে জীবন মাত্রার জন্য পানির সর্বোত্তম pH- (৬.৭~৮.৬) । মাছ pH-৫.০০ এর নিচে এবং pH-৭.০০ এর উপরে বেঁচে থাকতে পারে তবে এর সংখ্যা সীমিত।পানিতে দ্রবীভূত উপাদান যা পানির সাথে মিশে সমসত্ত্ব মিশ্রন তৈরি করে তাই পানিকে অজৈব যৌগ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যা অধিকাংশ আয়নিক ও পোলার সমযোগী যৌগকে দ্রবীভূত করতে পারে।
পানিতে দ্রবীভূত হয় এমন লবন বা আয়নিক যৌগ যেমন Nacl, CaCl2, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, ক্যালসিয়াম কার্বনেট যা Na+, Cl-, Ca2+ তৈরি করে। পোলার সমযোগী যৌগ অ্যালকোহল, গ্লুকোজ, এমোনিয়া পানিতে দ্রবণীয়, পানিতে O2, CO2, N2 ইত্যাদি দ্রবীভূত থাকে যা জলজ প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ পানিতে মিশে পানিকে বিষাক্ত করছে, প্রতিনিয়ত যার মধ্যে আর্সেনিক বাংলাদেশের পানির সবচেয়ে জনসংখ্যা হিসেবে নিহিত হয়েছে। এছাড়া লেড বা সীসা, ক্যাডমিয়াম, নিকেল, ক্রোমিয়াম প্রতিনিয়ত পানিতে মিশছে।
বাংলাদেশে যেসব বিষাক্ত ধাতু পানিতে মিশছে,তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
i. লেড বা সীসাঃ ব্যাটারি স্টোরেজ, ব্যবহৃত ব্যাটারি থেকে প্রধানত সীসা পানিতে মিশছে। এছাড়া লেড যুক্ত রঙ ও লেডযুক্ত ভ্যাসোলিন পানিতে মিশছে।
ii. ক্যাডমিয়ামঃ রঙ, Ni-Cd ব্যাটারি থেকে ফসফেট কারখানা থেকে ক্যাডমিয়াম পানিতে মিশছে।
iii. নিকেলঃ ইলেকট্রিক সামগ্রী, ব্যাটারি, জুয়েলারি, স্টেইনলেস স্টিল থেকে Ni পানিতে যুক্ত হচ্ছে।
iv. ক্রোমিয়ামঃ কাপড় ও চামড়াজাত পন্য তৈরিতে যে রঙ ব্যবহৃত হয় তা থেকে পানিতে ক্রোমিয়াম যুক্ত হচ্ছে।
v. আর্সেনিকঃ আর্সেনিক প্রধানত অগভীর নলকূপের পানিতে পাওয়া যায় যা ২০০ ফুটের ও কম।
পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (Dissolved Oxygen বা DO) হলো পানিতে মিশে থাকা মুক্ত আণবিক অক্সিজেন যা জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। এটি পানির গুনগত মান নির্ধারণ করে, এটির মাত্রা ৫mg/L ধরা হয়। DO- এর মাত্রা ২ mg/L এর নিচে নেমে গেলে মাছ মারা যায়। বাংলাদেশে নদী-নালা, খাল-বিল এ পানি পরীক্ষার ক্ষেত্রে DO- (৫ ~ ৬) mg/L ধরা হয়।
পানিতে উপস্থিত জৈব দূষক বা বর্জ্য পদার্থগুলো অনুজীব যেমন- ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ভাঙতে যে পরিমান অক্সিজেন প্রয়োজন হয় তাকে BOD (Biochemical Oxygen Demand) বলা হয়। BOD- এর মাত্রা যত বেশি হবে পানি দূষণের মাত্রা তত বেশি হবে। পানিতে BOD- এর পরিমান বেড়ে গেলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যায়।
বিশুদ্ধ পানির BOD- (১~২) PPM (mg/L) হলে ভালো।
নদীর পানি বা সাধারণ পানি ৩~৫ PPM
অত্যাধিক দূষিত পানি ১০ PPM বা তার বেশি।
আমাদের দেশে কৃষি জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে বিল-খালের পানি দূষিত হচ্ছে যার ফলে কৃষি জমিতে আগের মত ফসল পাওয়া যায় না, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পানির PH লেভেল সহনীয় মাত্রায় না থাকায় মাছের বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, মাছের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
COD (Chemical Oxygen Demand) বা রাসায়নিক অক্সিজেনের চাহিদা হলো পানিতে উপস্থিত জৈব বা অজৈব দূষক পদার্থ গুলোকে রাসায়নিক জারক দ্বারা জারিত বা ভাঙতে যে পরিমান অক্সিজেন প্রয়োজন হয় তাকে বুঝানো হয়।
পান যোগ্য পানির COD কমপক্ষে ৪ mg/L থাকতে হবে। দ্রুত পানি পরীক্ষার জন্য এটি কার্যকর পদ্ধতি। বর্জ্য শোধন প্লান্ট (Effluent Treatment plant- ETP) দক্ষতা পরিমাপ করতে এটি ব্যবহৃত হয়। এটি পানির জৈব ও অজৈব উভয় ধরনের দূষককে জারিত করতে পারে।
পানিতে COD বা রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা ১০ mg/L বা তার বেশি হলে সে পানি দূষিত হিসেবে গন্য করা হয়। পানিতে জৈব বা অজৈব দূষকের মাত্রা বেড়ে গেলে COD এর মাত্রা বেড়ে যায়।
বিশুদ্ধ পানি সাধারণত ২~৫ mg/L, কিছু ক্ষেত্রে < ৫ mg/L কে বিশুদ্ধ ধরা হয়। ১০ mg/L এর বেশি COD হলে এটিকে দূষিত হিসেবে ধরা হয়। ৫০ mg/L এর বেশি হলে এই পানিকে অতিরিক্ত দূষিত পানি হিসেবে গন্য করা হয়।
পানির প্রধান ব্যবহার সমূহ:
১. গৃহস্থলীর কাজ যেমন রান্না করা, গোসল, থালা-বাসন ধোয়া ,কাপড় ধোয়া,প্রভৃতি কাজে প্রচুর পরিমাণে পানি ব্যবহৃত হয়।
২. বাংলাদেশে শস্য উৎপাদনের জন্য সেচ কাজে প্রচুর পরিমাণে পানি ব্যবহৃত হয়।
৩. স্বাস্থ্যও পরিচ্ছন্নতার যেমন- শরীর সুস্থ রাখতে, টয়লেটের ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন থাকার পানির ব্যবহার অপরিহার্য ।
৪. শিল্পকল কলকারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া, শীতলীকরণ, বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী তৈরিতে পানি ব্যবহৃত হয়।
৫. মৎস্য চাষের জন্য পানির বিকল্প নেই ।পানি ছাড়া মাছের চাষ অসম্ভব । মাছের বেঁচে থাকার উপযোগিতার জন্য পানির নির্দিষ্ট pH লেভেল থাকতে হয়।
৬. গবাদি পশুর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পানের জন্য পানির ব্যবহার খুবই প্রয়োজনীয় ।
৭. বিদ্যুৎ উৎপাদনে পানি বিপুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে।
৮. নির্মাণ কাজে (যেমন ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট) পানির বহুল প্রচলন আছে ।সিমেন্ট, বালি, কংক্রিট/ পাথরের সাথে পানি ব্যবহার করা হয়, নির্মাণকে শক্ত ও মজবুত করতে পানি ব্যবহার করা হয় নির্মিত পিলারের ছাদে ।
৯. বিভিন্ন অগ্নি নির্বাপনে পানি ব্যবহৃত হয়।
১০. এছাড়া বিনোদনের জন্য ও জীবন রক্ষার জন্য যেমন সাঁতার কাটা, নৌকা চালানো, মাছ ধরার কাজে পানি ব্যবহার করা হয়।
১১. তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পানির ব্যবহারের প্রচলন আছে।
১২. এছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহনের জন্য পানিপথে হচ্ছে অন্যতম সেরা মাধ্যম।
১৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বা জীবের বেঁচে থাকার জন্য পানি পান করা অপরিহার্য ।
এবার আসা যাক পানির ব্যবহার (আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে/দেশ-বিদেশে) নিয়ে আলোচনা করা যাকঃ
আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম বা অগ্রজরা পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুবই সচেতন ছিল। পানযোগ্য পানির পর্যাপ্ত উৎস না থাকা সত্ত্বেও পুকুরের পানি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতেন। পানির উৎস বাড়ানোর জন্য তারা প্রচুর দীঘি,পুকুর, জলাধার খনন করেন যাতে সারা বছর বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করা যায়। সেই সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিতো তখন তারা সাধারণ পানি সংগ্রহ করে ফিটকিরি বা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করতেন। বড় বড় মাটির পাত্রে পানি সংগ্রহ করতেন,পান ও ব্যবহার করার জন্য। বর্তমানে আমরা পুরোটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি ভূগর্ভস্থ পানির উপর ,সেজন্য গভীর ও অগভীর নলকূপ বসানো হচ্ছে যথেচ্ছ ভাবে যা ভবিষ্যৎ পানির সংকট তৈরীতে ভূমিকা রাখবে ।
বিশ্বের দিকে যদি আমরা তাকাই ফোরাত নদী ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নদী যা তুরস্ক ,সিরিয়া, ইরাকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ইরাক ফোরাত নদীর পানি ব্যবহার করত তার কৃষিকাজ, দৈনন্দিন ব্যবহার এবং পানযোগ্য পানি পরিশোধনের মাধ্যমে। ইরাক- আমেরিকা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত ইরাকের জনগণ ফোরাত নদীর পানির উপর নির্ভরশীল ছিল। ইরাক- আমেরিকা যুদ্ধের সময় ফোরাত নদীর পানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়া ,দূষণ, লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ফোরাতের পানি ব্যবহার অনুপযোগীহয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধকালীন সময়ে ইরাক প্রথমবারের মতো গভীর নলকূপ বসানোর অনুমতি দেয় ব্যাপকহারে যা আপদকালীন সময়ে ইরাকি জনগণের পানির চাহিদা মেটাতে সাহায্য করেছিল।
এছাড়া ভিয়েতনামে মেকং নদীর পানি পরিশোধন করে নিত্য ব্যবহার্য ও পান যোগ্য পানির যোগান দেয়া হচ্ছে যা ভিয়েতনামের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ।উল্লেখ্য মেকং নদীর পানি ৬টি দেশ ব্যবহার করে যথাক্রমে চীন, মায়ানমার, লাউস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ,ভিয়েতনাম। আমাদের দেশে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি অত্যাধিক দূষণের কারণে বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে তাই শীতলক্ষ্যা নদীর পানি পরিশোধন করে ঢাকার পানি চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। নদীর পানি পরিশোধনের ক্ষেত্রে যেটি খেয়াল রাখতে হবে নদীর পানি প্রবাহ এবং নদীর পানির BOD ঠিক আছে কিনা। pH লেভেল সহনীয় মাত্রায় আছে কিনা। আমাদের দেশের অধিকাংশ নদী দূষণের কবলে পড়ে আছে যা ভবিষ্যৎ পানির চাহিদাকে হুমকির মুখে ফেলবে । নদী থেকে প্রবাহের হিসাব করে পানি পরিশোধনের জন্য পানি সংগ্রহ করতে হবে । অতিরিক্ত পানি সংগ্রহ করলে নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাবে যার ফলে নদীতে বসবাসকারী জলজ প্রাণী হুমকির মুখে পড়বে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে।
বর্তমানে আমাদের দেশে যে হারে গভীর ও অগভীর নলকূপ বসিয়ে পানির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে তা আমাদের দেশে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানিকে বলা হয় গোপন ব্যাংক একাউন্ট। এই পানি যত বেশি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা যাবে ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। আমরা দিনে দিনে আমাদের পানির রিজার্ভ ধ্বংস করে ফেলছি। আমাদের দেশে শিল্পকল কারখানায় বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রয়োজনে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে যা আমাদের পানি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাকে ফুটিয়ে তুলছে ।কিছু কিছু বৃহৎ কারখানা নদীর পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করছে। দেশের বেশিরভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরতা বাড়িয়ে তুলছে।
নদী তীরবর্তী কলকারখানা গুলো ও ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহার না করে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছে।
পাশাপাশি আমাদের নদী নালা খাল বিলের পানি ব্যাপক মাত্রায় দূষণের শিকার হচ্ছে। পানিতে মল মূত্র ত্যাগ করা কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবহারে পরিণত হয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নদী হ্রদের পানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে যা পানির বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত করছে। বাংলাদেশেও কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে যা আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করে যাচ্ছে।
দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীর পানির দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রজননে সক্ষম মা মাছের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। হালদার পানির দূষণ ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় এর অন্যতম কারণ। হালদাকে রক্ষা করতে হলে এর পানির pH এর মান সহনীয় পর্যায়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
বর্তমানে আমরা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ,অফিস আদালত, রেস্টুরেন্ট, খাবারের দোকানে বোতলজাত পানি পান করার জন্য ব্যবহার করছি। যে হারে আমাদের দেশে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে চলেছে তা আপদকালীন সময়ে যখন ভূপৃষ্ঠের পানি দূষিত হলে বা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়বে তখন কিভাবে আমরা পরিস্থিতি সামাল দিব সে বিষয়ে আমাদের কোন পূর্ব প্রস্তুতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আমরা জ্বালানী তেল ও ভোজ্য তেল দেশের বাইর থেকে আমদানি করছি। বোতলজাত পানি এখন হয়তো আমরা সীমিত আকারে পানের জন্য ব্যবহার করছি।একটা সময় হয়তো আমাদেরকে তেলের মত পানিও আমদানি করা লাগবে। ভোজ্য তেলের মত বোতলজাত পানিও কিনে পান বা ব্যবহার করতে হবে ।এ থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পানির ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণের জন্য করণীয় নিয়ে আলোচনা করা যাক।
১) নতুন নতুন পানির উৎস সৃষ্টি করা যা ব্যবহার ও পান করা যায় ।
২) নদীর পানির প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাতে নদীর পানির দূষণ রোধ করা যায়, পাশাপাশি নদীর নাব্যতা ঠিক রাখার জন্য।
৩) নদীর ধারে যেসব শিল্প কল কারখানা আছে সেগুলোর বর্জ্য যাতে পরিশোধন ব্যতিরেকে নদীতে না ফেলা হয়।
৪) কৃষি জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত করা যাতে কৃষি জমিতে মাছের আবাসস্থল নষ্ট না হয়।
৫) শিল্প কারখানায় ETP স্থাপন বাধ্যতামূলক করা।
৬) নদীর, জলাশয়ের, হৃদের পানির PH, BOD ও COD নিয়মিত পরীক্ষা করা।
৭) খাল খননের মাধ্যমে বেশি পরিমাণে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা ।
৮) নতুন নতুন জলধার তৈরি করে (যেমন পুকুর, দীঘি) বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা।
৯) দেশের প্রধান অর্থকারী নদী কর্ণফুলী ও একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীর পানি দূষণ থেকে রক্ষা করার জন্য জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
১০) গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনের পরিবর্তে বৃষ্টির পানি ব্যবহারের জন্য জলধার নির্মাণ করা যা ব্যবহার ও পান করা যায়। পাশাপাশি গভীর নলকূপ স্থাপন কমিয়ে এনে ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া।
১১) পাহাড়ি ঝর্ণার পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করা, পাশাপাশি পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে কৃত্রিম জলধার তৈরি করা যা দিয়ে দীর্ঘদিন পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা যায়।
১২) ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়াতে হবে সেজন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
১৩) অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীগুলোর (প্রায় ৫৪ টি) পানি প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য যৌথ নদী কমিশনকে শক্তিশালী করে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে।
১৪) পানি বোতলজাত করার ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠের পানি যেমন বৃষ্টির পানি, হৃদের পানি, ঝর্ণার পানি পরিশোধন করে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া যাতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বহির্বিশ্বে রপ্তানি করা যায়।
সর্বোপরি জাতীয় পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ কমিটি গঠন করা যাতে জাতীয়ভাবে পানির ব্যবহার, উৎসের সন্ধান, দূষণ রোধ, সংরক্ষণ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
পরিশেষে বলতে চাই নদী খাল- বিল,পুকুর জলধার বাঁচান তাহলে জীবন বাঁচবে। জীবন বাঁচাতে পানির বিকল্প পানিই।





