সারাদেশ

ঈদ এলেই জ্বলে ওঠে আগুন, বাঁচে সংসার—তবু নিভে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের কামারদের জীবনসংগ্রাম

ওয়াসিম শেখ, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
টুংটাং হাতুড়ির শব্দ, হাপরের আগুন আর ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীর-এসবই যেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কামারপল্লিগুলোর চিরচেনা দৃশ্য। আগুনে লাল হয়ে ওঠা লোহায় একের পর এক আঘাত করছেন বৃদ্ধ কর্মকাররা। পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই জমে উঠেছে তাদের ব্যস্ততা। কিন্তু এই ব্যস্ততার আড়ালেই লুকিয়ে আছে অভাব, কষ্ট আর টিকে থাকার নিরন্তর যুদ্ধ।
বছরের অধিকাংশ সময় কাজের তেমন চাপ না থাকলেও কোরবানির ঈদকে ঘিরেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় কামারশালাগুলো। দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি তৈরির কাজে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের পাশে কাটছে তাদের সময়। কিন্তু বাড়তি পরিশ্রমের পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত আয়।
রামগাতী এলাকার কারিগর মিন্টু কামার বলেন, আগে ঈদের এক মাস আগ থেকেই অর্ডার সামলাতে পারতাম না। এখন বাজারে কারখানার তৈরি জিনিস চলে আসছে। মানুষ কম অর্ডার দেয়। লোহা, কয়লা সবকিছুর দাম বেড়েছে। সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে।
কথা বলতে বলতে চোখের কোণে জল জমে ওঠে তার। জানান, বছরের ১১ মাস ঠিকমতো কাজ না থাকায় অনেক সময় ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হয়। ঈদের এই মৌসুমের আয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকেন তারা।
আরেক কর্মকার সোলেমান কর্মকার বলেন, এই আগুনের পাশে কাজ করতে করতে শরীর শেষ হয়ে গেছে। ডাক্তার আগুনের কাজ কম করতে বলেছে। কিন্তু কাজ না করলে পরিবার চলবে কীভাবে? ছেলে-মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে এখনো হাতুড়ি চালাই।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক কামারশালায় বয়স্ক কারিগররাই এখনো কাজ করছেন। কারও চোখে ঝাপসা দেখে, কারও হাতে কাঁপুনি-তবু থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। কেউ কেউ আবার শ্রমিক রেখে কাজ করাচ্ছেন, কারণ একা আর আগের মতো কাজের চাপ নিতে পারেন না।
কালিয়া কান্দাপাড়া এলাকা থেকে ছুরি ও চাপাতির অর্ডার দিতে আসা হারুন বলেন, “দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু তাদের অবস্থাও খারাপ। কষ্ট করেই তো এগুলো বানায়।
বিভিন্ন কর্মকারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বড় ছুরি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। চাপাতি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং দা, বঁটি ও ছোট ছুরি প্রকারভেদে ৫০০ টাকা কেজি দরে বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে কাঁচামালের দাম ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই আয় থেকেও তেমন সঞ্চয় থাকে না।
ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কামারশালার ব্যস্ততা। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখার পাশে দাঁড়িয়ে জীবন গড়া এই মানুষগুলোর চোখে এখন আনন্দের চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি। তবু পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে আগুনের উত্তাপ আর হাতুড়ির আঘাত সহ্য করেই প্রতিদিন লড়ে যাচ্ছেন সিরাজগঞ্জের এসব কর্মকার।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সারাদেশ

মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হলেন সাব্বির আহমেদ সামাদ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজার জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জেলার একনিষ্ঠ ও ত্যাগী ছাত্রনেতা সাব্বির আহমেদ সামাদ।
সারাদেশ

বদলে যাচ্ছে র‌্যাব: পরিবর্তন হচ্ছে নাম, লোগো ও পোশাক

নতুন রূপে আসছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ বাহিনীর নাম, লোগো ও পোশাক পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়,